‘শাট আপ, এরদোগানের আপনার অভিনন্দনের প্রয়োজন নেই’

মাসুম খলিলী

তুরস্কের শীর্ষ দৈনিক হুররিয়াত ডেইলি নিউজের এই খবরটির প্রতি নিশ্চয়ই অনেকের দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে। রিপোর্টটির শিরোনাম হলো এরদোগানের মুখপাত্র এক মার্কিন কংগ্রেসম্যানকে বলেছেন ‘শাট আপ’। এতে বলা হয়,তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তায়িপ এরদোগানের মুখপাত্র একজন মার্কিন কংগ্রেসম্যানকে ‘শাট আপ’ বলে সতর্ক করেছেন যিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেছেন যে, তিনি ২৪ জুনের নির্বাচনে এরদোগান জোটের বিজয়কে উদযাপন করবেন না।

মার্কিন রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান অ্যাডাম শিফ এক টুইট বার্তায় লিখেন: “গ্রেফতার, সহিংসতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দলন করার মাধ্যমে বিরোধীদলকে হতাশ করে এই সপ্তাহান্তে তুরস্কের এরদোগান ‘পুনরায় নির্বাচিত হন।’ স্বৈরশাসনের তুরস্কের বংশধর আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিলো যে, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র আগ্রাসনের শিকার। তাকে অভিনন্দন জানাবেন না’।

এর জবাবে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের মুখপাত্র ইব্রাহিম কালিন বলেছেন প্রেসিডেন্ট এরদোগানের আপনার অভিনন্দন এর প্রয়োজন নেই। তুরস্কের জনগণই কথা বলছে। আপনার কথার প্রয়োজন নেই।

আমেরিকান রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান অ্যাডাম শিফের এই বক্তব্যের রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। তুর্কি নেতার এই অবিষ্মরণীয় বিজয়ে পাশ্চাত্যের অনেক গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়ার সুরটি ছিল এ রকম। বৃটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট প্রতিবেদনটি শুরু করেছে এভাবে- তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোগান তার ভাষণে প্রায়ই তার সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, “এক জাতি, এক পতাকা, এক দেশ এবং এক রাষ্ট্র” আর তিনি প্রতিটি সমর্থককে তার এই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করার আহ্বান জানান। ইকোনমিস্ট এরদোগানের এবারের নির্বাচনে জয়ের পর তার মন্তব্যে আরেকটি নতুন শব্দ যোগ করার কথা বলেছে আর সেটি হলো-একজন মানুষ।

ইকোনমিস্টও রিপাবলিকান সিনেটরের মতো এরদোগানের ব্যাপারে পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রকাশ ঘটিয়েছে। এরদোগানের প্রবর্তিত নির্বাহি প্রেসিডেন্টের ব্যবস্থায় রাষ্ট্র প্রধানের হাতে যে ক্ষমতা তা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার চেয়ে কোন অংশে বেশি নয়। এর পরও পাশ্চাত্যের অনেক নীতি নির্ধারক ও গণমাধ্যম এরদোগানের ব্যাপারে যতটা সমালোচনামুখর ততটা নয় মধ্যপ্রাচ্য বা অন্যান্য স্থানের রাজাধিরাজ বা একনায়কদের ব্যাপারে। এর অন্তর্নিহিত কারণ হলো এরদোগানের নীতি পদক্ষেপ পাশ্চাত্যের আশা আকাক্সক্ষার বিপরীত পথে চালিত। এ কারণে নির্বাচনে জয়ী হতে এরদোগানকে যতটা চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হয়েছে তার চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ জয় করতে হবে নতুন সরকারের অভিযাত্রায়ও।

ডাবল জয়, তবুও অপূর্ণতা

এরদোগান এবং তার একে পার্টি সহযোগী জাতীয়তাবাদী দল এমএইচপিকে নিয়ে তুরস্কের ২৪ মে জুনের নির্বাচনে ডাবল বিজয় অর্জন করেছে। ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা এরদোগান বারবার একটি শক্তিশালী নির্বাহী রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে বলেছেন যে, তুরস্ককে একটি আত্মবিশ্বাসী ও স্থিতিশীল দেশ তৈরি করতে হবে যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য পদক্ষেপ নেবে জোরালোভাবে । নির্বাহি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার পর তিনি রাষ্ট্রের সব শাখায় অধিকতর ক্ষমতার অধিকারী হলেন। নতুন ব্যবস্থার অধীনে পুনরায় নির্বাচিত এরদোগান ভাইস প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী, উচ্চ স্তরের কর্মকর্তা এবং সিনিয়র বিচারক নিয়োগ করতে পারবেন। এর পাশাপাশি সংসদও তিনি বিলুপ্ত করতে পারবেন। তবে সংসদ ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে একই দিন। ফলে সংসদ নির্বাচনের সাথে সাথে জনগণের রায় নিতে হবে প্রেসিডেন্টকেও। নির্বাহী আদেশ এবং জরুরী অবস্থাও জারি করতে পারবেন প্রেসিডেন্ট। পরে সংসদে এগুলোর অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোগান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি প্রার্থী মুহার্রিম ইনসকে পরাজিত করেন। তিনি মোট ভোটের প্রায় ৫২.৬ ভাগ লাভ করেন। মুহার্রিম ইনস পান ৩০.৭ শতাংশ ভোট। ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়ায় আর দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের প্রয়োজন হচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বাকি প্রার্থিদের মধ্যে কারাগারে আটক কুর্দি নেতা সেলাহাত্তিন ডেমিরটাস ৮.৪ শতাংশ এবং রক্ষণশীল আইয়ী পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মেরল আকসেনের ৭.৩ শতাংশ ভোট পেয়েছেন।

একই সময়ে অনুষ্ঠিত সংসদীয় ভোটে এ কে পার্টি এবং তার জোট সহযোগী এমএইচপি ৫৩.৬ শতাংশ ভোট এবং ৬০০ আসনের মধ্যে ৩৪৪টি আসন পেয়েছেন। ইনস এর সিএইচপি এবং আইয়ী পার্টির বিরোধী জোট মোট ৩৩.৯ শতাংশ ভোট লাভ করে ১৮৯ টি আসন পেয়েছে। ডেমিরটাসের এইচডিপি ১১ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ৬৭ আসনে জয় পেয়েছে।

এরদোগানের সাফল্য সত্বেও তার দল একে পার্টি এককভাবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্টতা পায়নি। ২০১৫ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত শেষ সংসদ নির্বাচনের তুলনায় একে পার্টি সাত শতাংশ ভোট হারিয়েছে। ফলে ৬০০ আসনের সংসদে একে পার্টির আসন দাঁড়িয়েছে ২৯৫ টিতে যা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে ৫টি কম। তবে বিস্মযকর হলো এরদোনের এই জয়লাভে তার নতুন কোয়ালিশন অংশীদার এমএইচপি চাঙ্গা হয়েছে। বেশিরভাগ বিশ্লেষকের মতে, এমএইচপি যে ভোট পাবে বলে ধারণা করেছিল বাস্তবে তার প্রায় দ্বিগুণ তথা ১১.১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। সংসদে এর বিপরীতে আসন পাবে ৪৯টি।

কট্টর জাতীয়তাবাদী দলের এই সাফল্য এর নেতা ডেভলেট বাসেলির প্রতি এরদোগনের একে পার্টিকে নির্ভরশীল করে তুলেছে। একে পার্টি যে ২৯৫টি আসন পেয়েছে তা একক সংখ্যাগরিষ্টতার চেয়ে কম হওয়ায় সংসদে বিল পাসের জন্য বাসেলির এমএইচপির সহায়তা লাগবে। বিশিষ্ট ভাষ্যকার সোলি ওজেল বলেছেন, এরদোগান রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, তাই তিনি খুব ভাল অনুভব করবেন, কিন্তু তিনি এখন সংসদে বাসেলির প্রতি দায়বদ্ধ থাকবেন।

সংসদীয় পদ্ধতি থেকে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতিতে যাওয়ার বিষয়টি ছিল এরদোগানের অনেক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের। এমএইচপি ছাড়া বাকি সব দলই এর বিরোধিতা করেছে। ২০১৭ সালের নির্বাচনে একেবারে স্বল্প ভোটের ব্যবধানে এ সংক্রান্ত সংবিধানের সংশোধনী পাস হয়েছে। রাজধানী আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলের মতো শহরেও সংশোধনীর বিপক্ষে বেশি ভোট পড়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী আহমদ দেভতুগ্লু এই প্রক্রিয়ার সাথে একমত হতে না পারায় তাকে সরকার ও একে পার্টির নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে।

এসব বিবেচনায় হয়তো এরদোগান আগে থেকেই এমএইচপির সাথে সমঝোতায় গেছেন এবং পিপলস জোট গঠন করেছেন। এটি না করলে স্পষ্ট যে এরদোগানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া অথবা সংসদে সংখ্যাগরিষ্টতা পাওয়া সম্ভব হতো না।

সেক্যুলারিস্টদের জন্য হতাশা

প্রধান বিরোধি দল কামালপন্থী সেক্যুলারিস্ট দল সিএইচপি’র জন্য নির্বাচনী ফল এবার হতাশা নিয়ে এসেছে। দলের প্রার্থি ইনস ইস্তাম্বুলের একটি বিশাল সমাবেশের মধ্য দিয়ে প্রচারণার সমাপ্তি টেনেছিলেন। কিন্তু তার নির্বাচনের সমাপ্তি ঘটেছে মোট ভোটের এক তৃতীয়াংশের কম পেয়ে। আর সংসদ নির্বাচনে তার চেয়েও ৮ শতাংশ কম ভোট পেয়েছে সিএইচপি। সিএইচপি সম্ভবত কুুর্দি দল এইচডিপি যাতে ১০ শতাংশের ন্যুনতম আসন প্রাপ্তির বেশি ভোট পায় আর একেপি সংখ্যাগরিষ্টতা হারায় তার জন্য সমর্থকদের তাদের পক্ষে ভোট দিতে বলেছে। এ কারণেে দেখা যায় সিএইচপির প্রেসিডেন্ট প্রার্থির চেয়ে সংসদের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোট ৮ শতাংশ কম। আর এইচডিপির প্রেসিডেন্ট প্রার্থির চেয়ে সংসদের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোট তিন শতাংশের মতো বেশি।

এই ধরনের ফলাফল বিরোধি দলের জন্য মোটেই মর্যাদাকর হয়নি। যার ফলে সিএইচপি প্রার্থি ইনস জনগণের সামনে সরাসরি হাজির না হয়ে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা দিয়ে এরদোগানের বিজয়কে মেনে নিয়েছেন। এরদোগানের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি লিখেছেন “লোকটি জয় পেয়েছে”। একজন সাংবাদিক মধ্যরাতে টেলিভিশনে সরাসরি তার বার্তাটি পড়ে শোনান। এতে তিনি বলেন “অবশ্যই সম সুবিধার উপর প্রতিযোগিতাটি হয়নি, তবু তিনি জিতেছেন।” বিরোধী দল নির্বাচনকে মুক্ত ও অবাধ বলে গ্রহণ করলেও ন্যায্য বলে মেনে নেয়নি। ক্ষমতাসীন দলকে তরঙ্গ প্রচারণায় একচেটিয়া অধিকার দেওয়ার অভিযোগ আনেন তারা।

সংলাপের প্রস্তাব ও কর্তৃত্ববাদিতার সমালোচনা

এরদোগান ইস্তাম্বুলের বাসভবনে জোড়া বিজয়ের বক্তৃতায় বিরোধ উত্তরণে সংলাপের প্রস্তাব করে বলেছেন, “এখন সময় হলো উত্তেজনাকে পিছনে ফেলে আমাদের ভবিষ্যতের প্রতি দৃষ্টি দেবার।” এর কয়েক ঘন্টা পরে আঙ্কারায় তার পার্টির সদর দফতরের বেলকনি থেকে দেয়া বক্তৃতায় তিনি উল্লসিত হাজার হাজার সমর্থকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ভিন্ন দিকে। তিনি বলেন, দুই বছর আগের হিংসাত্মক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকারীরা দেখেন কোথায় পালিয়েছে। আমেরিকায়। নির্বাচনের ফলের দিকে তাকান, সেখানে বিরোধীরা অনেক বেশি ভোট পেয়েছেন।

২০১৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে যে সংবিধান সংশোধনী পাস হয়েছে এবারের প্রেসিডেন্ট এবং সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা কার্যকর হবে। পরিবর্তনগুলি তুরস্কে সংসদীয় গণতন্ত্র থেকে রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থায় রূপান্তর নিয়ে আসবে । সরকারি দল নির্বাহি রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দিলেও বিরোধী দল, তুরস্কের পশ্চিমা মিত্র এবং অন্যান্য সমালোচকগণ বলছেন যে, সিস্টেমটি প্রেসিডেন্টকে এমন সব নতুন ক্ষমতা প্রদান করবে যাতে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য ব্যাহত হবে।

বিশ্লেষক ও কলামিস্ট অভনি ওজুরেরল অবশ্য মনে করেন যে, নতুন ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে তুরস্ককে আরো দক্ষ ও স্থিতিশীলভাবে পরিচালিত করার সুযোগ দেবে। তবে প্রাথমিক বাস্তবায়ন পর্যায়ে এতে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, “এরদোগান এবং তার দল অভিজ্ঞতা অর্জন করবে আর এটি বাস্তবায়নের সময় সিস্টেমের ত্রুটিগুলি সংশোধন করার চেষ্টা করবে। এই জন্য নতুন ডিক্রি জারি এবং আইন প্রনয়ন করা হবে।

ইস্তাম্বুল সেহির বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেসুত ইয়েগেন বলেন, এরদোগান তুরস্কের প্রথম নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হবার পথে সকল বাধা অতিক্রম করে লক্ষে পৌছেছেন।

ইয়েগেন উল্লেখ করেন ,” সম্ভবত এরদোগান এবং তার দল গত কয়েক বছরে তিনি যে নীতিগুলি অনুসরণ করেন তা বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখতে চান বলে এমএইচপি-এর সাথে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন । এই ক্ষেত্রে, একে পার্টি এমএইচপির সাথে সহযোগিতা করতে বাধ্যও হবে।

জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার হবে কি?

২০১৬ সালের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্তান সময়ের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে। জরুরি অবস্থার আওতায় নেয়া বিভিন্ন ব্যবস্থার ব্যাপারে দেশে বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়। ইয়েগেন বলেছেন যে, জরুরি অবস্থার অধীনে সাম্প্রতিক পদক্ষেপ তুরস্কের অভ্যন্তরে উচ্চতর উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে এবং মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে একটি কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকার।

এরদোগান দায়িত্ব গ্রহণের পর অবশ্য জরুরী অবস্থার অবসান হতে পারে। তিনি তাঁর প্রচারাভিযানের শেষ দিনে এটি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে ২০১৬ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে গ্রেফতার করা হাজার হাজার বন্দী নমনীয় আচরণ পাবেন কিনা, অভ্যুত্থানে মদদ দেয়ার জন্য পশ্চিমের সমালোচনা বা সংবাদপত্রের প্রতি কঠোর মনোভাবের অবসান ঘটবে কিনা সেটি নিশ্চিত নয়। একে পার্টির ভোট কমার পেছনে জরুরি অবস্থাকালীন কিছু বাড়াবাড়ির পদক্ষেপ দায়ী বলে অনেকে মনে করেন।

অর্থনীতি নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

এরদোগান ও একে পার্টির জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ হলো তুর্কি অর্থনীতিকে নতুন প্রাণ দেয়া। এরদোগানের শাসনামলে যে অগ্রগতি তুর্কি অর্থনীতিতে হয়েছে তা অতুলনীয়। কিন্তু এবারের নির্বাচনে অর্থনীতিই ছিল বড় ইস্যু। নির্বাচনী প্রচারণার সময় অর্থনীতির অবস্থা নিয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। বলা হয়েছে, গত বছরের জানুয়ারিতে ৭.৪ শতাংশ থেকে এবার প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। বেড়েছে বেকারত্ব। আর মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা লিরার দাম ২০ শতাংশ কমে গেছে।

নির্বাহি প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং অবনতিশীল মুদ্রামান ঠেকানোর বিষয় নিয়ে এরদোগানকে বিশেষভাবে সচেষ্ট হতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে, ফোকাস থাকবে পশ্চিমের সাথে টানাপড়েনে ও সম্পর্কের উন্নয়নের বিষয়টিতে।

মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে এরদোগানের দিকে তাকিয়ে-

মধ্যপ্রাচ্য বিশেষত ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার সংঘাতের নিরসনের ব্যাপারে মুসলিম বিশ্ব তাকিয়ে আছে এরদোগানের প্রতি। যুক্তরাষ্ট্র জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেবার পর ওআইসির চেয়ারম্যান হিসাবে এরদোগান জরুরি শীর্ষ সম্মেলন আহবান করেন। এই সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে পূর্ব জেরুসালেমকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী ঘোষণা করা হয়। সিরিয়া এবং গাজার অসহায় মানুষগুলোার জন্য কার্যকরভাবে এগিয়ে এসেছেন এরদোগান। এ কারণে মুসলিম বিশ্বের এই সংকট সময়ে এরদোগানের প্রয়োজন তুরস্কের জন্য যতটা ততখানি দরকার মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের জন্যও ।

চ্যালেঞ্জ জয় করতে হবে

এরদোগান প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জকে জয় করেই সামনে এগুতে অভ্যস্ত। বিশ্লেষক ইয়েগান বলেছেন, “এখন এরদোগান স্বস্তিতে রয়েছেন, তার ক্ষমতা ও শক্তি দিয়ে যদি তিনি চান তাহলে একটি নতুন পৃষ্ঠা খুলতে দিতে পারেন । তিনি একটি নির্দিষ্ট সময়ে এমএইচপিকে সাথে রেখেও প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি এবং ডানপন্থী আইওয়াইআই পাটির সাথে বিভিন্ন নীতিগত এলাকায় সহযোগিতা করতে পারেন। তিনি কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী পিকেকের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন দেশের ভেতরে ও বাইরে গিয়ে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বেছে নিয়েছেন কুর্দি বিনালি ইয়েলদিরিমকে। নতুন সরকারে বিনালি এবং বাসেলি সম্ভবত ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

এরদোগান এই দফায় ২০২৩ এবং আরেক মেয়াদে জয়ী হতে পারলে ২০২৮ সাল পর্যন্ত তুর্কি জাতির নেতৃত্ব দিতে পারবেন। এটি এমন এক জাতি যারা অর্ধ পৃথিবীব্যাপি প্রতিষ্ঠিত খেলাফতের নেতৃত্ব দিয়েছে প্রায় ৭ শত বছর। এরদোগান সেই সোনালি সময় আবার ফিরিয়ে আনার স্বপ্নই সম্ভবত দেখে থাকেন। আর এই স্বপ্ন যারা দেখেন তাদের প্রতি ফুলের ঢালি দিয়ে অন্য পক্ষ অভিনন্দন জানাবেন এমন প্রত্যাশা করা যেতে পারে না।

Facebook Comments

comments