তুরস্ক থেকে বাংলাদেশ – ইসলামী আন্দোলনের এপিস্টেমলোজিকাল ক্রাইসিস

জাবাল আত-তারিক

উপনিবেশবাদ বলেন আর সাম্রাজ্যবাদ বলেন, দুইটাই মুসলমানদের মন ও মগজে চিন্তার যে ছাঁচ তৈরি করে দিয়েছে সেটা আমাদের নেতাদের থেকে শুরু করে অতিসাধারণের মধ্যে গভীর ভাবে স্থায়িত্ব পেয়ে গেছে। আপনি যদি ইসলামী দলগুলোকে দেখেন, কিংবা মালয়েশিয়ার ও তুরস্কের ইসলামী দলগুলোকে দেখেন- সবাই একই ছাঁচে চিন্তা করছে। বাহ্যিক কিছু ইসলামিক মূল্যবোধের ভাঙ্গা রেকর্ড এরা বাজায় বটে, কিন্তু দিন শেষে এদের জোট করা, ভোট করা ও পলিসি মেক করার মূল বেইসটা সেই পশ্চিমা এপিস্টেমোলজি থেকেই উৎসারিত। অথচ ইনাদের উচিৎ ছিল ইসলামিক এপিস্টেমলজি দিয়া নিজেদের প্রস্তাবনা গুলো সাজানো কিন্তু সেটা তারা করছেন বলে মনে হচ্ছে না।

Epistemology অনেকের কাছে নয়া শব্দ মনে হতে পারে কিন্তু জ্ঞান পরিসরে এইটা খুবই ফান্ডামেন্টাল ও পরিচিত একটা শব্দ। বাংলায় এটার অর্থ হল জ্ঞানতত্ত্ব। কিন্তু শব্দার্থ দিয়ে তো আর সব কিছু বুঝা যায় না। তো সঙ্গাগত দিক দিয়ে বুঝতে চাইলে বলতে হবে, এপিস্টেমলোজি হল জ্ঞানের পদ্ধতি, শুদ্ধতা ও আওতা বিষয়ক তত্ত্ব। অর্থাৎ একটা নির্দিষ্ট বিষয়কে যখন আপনি সংজ্ঞায়িত করবেন কিংবা ব্যাখ্যা করবেন, তখন আপনাকে ঐ বিষয়ের জ্ঞানগত পদ্ধতি, শুদ্ধতা সম্পর্কিত ও আওতাগত তত্ত্বকে পরিষ্কার করতে হবে। আপনাকে পরিষ্কার করতে হবে যে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আপনি যে ধারণা দিচ্ছেন, যে পরি-কাঠামো হাজির করছেন, সেটার জ্ঞানগত উৎস কি? জ্ঞান গত উৎস আর রেফারেন্সের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ রয়েছে। রেফারেন্স হল আপনি কোনও বই বা ডকুমেন্ট থেকে একই ধরণের বিষয়কে টেনে এনে দেখাচ্ছেন যে আপনার আলোচনার পক্ষে বিপক্ষে কি কি মতামত ও বিশ্লেষণ রয়েছে। কিন্তু এপিস্টেমলোজি হল আরেকটু গভীরের বিষয়। এখানে আপনাকে দেখাতে হবে যে একটি বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট টার্মিনলজিগুলোর আভ্যন্তরীণ চিন্তাটা কোন ধরণের জ্ঞান শাখা থেকে গঠিত হয়েছে। এই টার্মিনলোজি কে অপারেশনাল ডেফিনেশনের দিক থেকে এবং জেনারেল আন্ডারস্ট্যান্ডিঙের দিক থেকে একরকম দেখা গেলেও ভিন্ন ভিন্ন আইডিওলজির দিক থেকে এটার শেকড় জ্ঞানের ভিন্ন ভিন্ন রকমের উৎসের সাথে মিশে থাকে। ফলে বিভিন্ন রকমের উৎস গুলো পরস্পর ব্যাপক ভাবে সাংঘর্ষিক হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংজ্ঞাটি যেই ধরণের জ্ঞানের উৎস থেকে নেয়া হয়েছে, সেই সংজ্ঞাটি সেই গোষ্ঠী ও শক্তিকেই লাভবান করবে যে মতবাদের জ্ঞান শাখা থেকে সংজ্ঞাটির আভ্যন্তরীণ চিন্তাটি গঠিত হয়েছে।

আমরা যারা বোকা জনতা, তারা প্রায়শই মুখস্থ বলে থাকি যে- শিক্ষায় রাজনীতি থাকা উচিৎ না। অনেক উচ্চ শিক্ষিত লোকেও একথা বলেন। অথচ শিক্ষার রাজনীতির শিকার হয়ে উচ্চ শিক্ষা নিয়েই তারা আজ এ কথা গুলো বলছেন। এক দিক থেকে তাঁদের এই দাবী যৌক্তিক। কারণ রাজনীতি বলতে তারা ক্যাম্পাসের দলাদলিকেই বুঝছেন হয়তো। এই দলাদলি থেকে উৎসারিত সংঘাত থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষার্থেই তারা একথা গুলো বলে থাকেন। কিন্তু শিক্ষার জঘন্যতম রাজনীতিটা তো এই এপিস্টেমলোজি নিয়েই। এটা তারা বুঝেন না বলে এটা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তাও করেন না। সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আমাদের শিক্ষার্থীরা শান্তি, মানবতা, সমঅধিকার, মুক্তচিন্তা, প্রগতি, মৌলিক অধিকার, ন্যায়, অন্যায়, টেররিজম, জঙ্গিবাদ, রাষ্ট্র, ধর্ম, রাজনীতি ইত্যাদি টার্মিনলজির যে সংজ্ঞা, ব্যাখ্যা, পরি-কাঠামো ও আওতা শিখছেন সেটার উৎস কি? এই উৎসটা নিঃসন্দেহে ইসলাম, আল্লাহ ও রাসুল বর্জিত সেক্যুলার জ্ঞান শাখা থেকে পরিগঠিত হয়ে টেক্সট বুক, বই, আর্টিকেল, খবরের কাগজ ও অন্যান্য আলোচনায় এসেছে। সুতরাং এই টার্মগুলোর আভ্যন্তরীণ চিন্তা ও চেতনা আগা গোড়া খোদা হীন নাস্তিক্যবাদি সেকুলার এজেন্ডা বাস্তবায়নের কাজেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আর সেক্যুলার সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত এসব স্ট্যান্ডার্ডে দাঁড়িয়েই ইসলাম পন্থী দলগুলো একজন আরেকজনের বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। তারা নিজেদের মধ্যে ঐক্যের চিন্তা তো করছেই না বরং উলটো একে অপরের পথ কে কঠিন করতে শত্রুদের তাবুতে যোগ দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের ইসলামী দল সাদেত পার্টি এরদোয়ানের বিরুদ্ধে গিয়ে সেক্যুলারদের তাবুতে গিয়ে জোট গড়ার কারণ গুলো যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখা যাবে যে ইসলামি আন্দোলনের লোকেরা কতটা উপনিবেশবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী জ্ঞান ধারার এপিস্টেমোলোজিতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। সাদেত পার্টির প্রধান উস্তায তেমেল কারামোল্লাউগলো এরদোয়ানের বিরুদ্ধে যাওয়ার পেছনে যে কারণ গুলো উল্লেখ করলেন সেগুলো সামনে নিয়ে আমি একটু চিন্তা করলাম। সেই কারণ গুলো হলঃ বেকারত্বের হার বৃদ্ধি, ট্রেড ডেফিসিট, বিশৃঙ্খল বিদেশ নীতি, ইয়োরোপীয় ইউনিয়নের মেম্বারিশীপ এপ্লিকেশনে গড়মশি এবং ২০১৬ সালের ব্যর্থ ক্যু অপচেষ্টার পর থেকে চলতে থাকা স্টেট অফ ইমার্জেন্সি। তাঁদের মতে এগুলো মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতাকে খর্ব করছে। এর পরে তাঁদের অভিযোগের তালিকায় রয়েছে ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশনের ইস্যুও। এরদোয়ান একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করছেন এবং ক্ষমতাকে নিজের মুঠোয় কুক্ষিগত করে ফেলছেন… এগুলোও তাঁদের অভিযোগ। আপনি যদি সেক্যুলারদের দিকে তাকান, তাহলে হুবহু একই অভিযোগ গুলো ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে দেখবেন। আমার প্রশ্ন হল, কোন দিন থেকে ইসলাম, মুসলমান আর বাতিল সেক্যুলারদের চিন্তা, চেতনা, কথা, নেগোসিয়েশন ও অংকের সূত্র এভাবে হুবহু মিলে গেলো? এই প্রশ্নটার উত্তর পেতে হলে আপনাকে ফের এপিস্টেমলোজি দিয়েই শুরু করতে হবে।

একটু ভাবুন, সাদেত পার্টি ও সেক্যুলার দলগুলো এরদোয়ান প্রশ্নে কিভাবে একই বিন্দুতে একই তাবুতে গিয়ে ঠেকলেন। কেন ইসলামী দলের চিন্তা ভাবনা সেক্যুলারদের সাথে এমন এক্সটেন্টে মিলে গেলো যে সাপ ও নেউলে একই পাত্র থেকে দুধ পান করতে শুরু করে দিলো? কেনইবা পশ্চিমা মিডিয়ার তাঁদের এই অস্বাভাবিক যুগল পালে হাওয়া দিতে একযোগে নেমে গেলো? আপনি কি মনে করে এগুলো এমনি এমনি হচ্ছে?

খেয়াল করে দেখুন, সেক্যুলারদের মত করেই সাদেত পার্টি বেকারত্ব, ট্রেড ডেফিসিট, অস্থিতিশীল বিদেশনীতি, ইইউ মেম্বারশীপ এবং জরুরী অবস্থা কে একক ভাবে এরদোয়ানের বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছে। এবং সেক্যুলারদের মতো করেই তারা এগুলোকে মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার সাথে রিলেট করছে। একইসাথে তারা সেক্যুলারদের সাথে গলা মিলিয়ে ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন, একনায়কতন্ত্র ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করার বিষয় গুলো কে বার বার হাইলাইট করছে। এখানে ইসলামী দল হিসেবে সাতেদ পার্টি ইসলামিক এপিস্টেমলোজি থেকে মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার বিষয়টিকে না দেখে সেক্যুলার এপিস্টেমলোজি থেকে দেখেছেন বলেই আমার মনে হয়েছে। এই যে কথায় কথায় আমরা শান্তি, অধিকার, সমতা, উদারতা, মানবতা, মুক্তমত, ডিসেন্ট্রালাইজেশন অফ পাওয়ার, অথোরেটারিয়ান সহ অন্যান্য টার্মিনলজি ব্যবহার করে রাজনৈতিক, আদর্শিক ও ধর্মীয় বিষয়াদি বিচার বিশ্লেষণ করি, আমরা কি কখনও ভেবেছি যে, এই টার্ম গুলোর সার্বজনীন সংজ্ঞাটি কি? যে সংজ্ঞাটির আলোকে আমরা এগুলোকে বুঝে থাকি সে সংজ্ঞা কারা তৈরি করেছে? যারা তৈরি করেছে তারা কোন ধরণের জ্ঞান-শাখা থেকে এই সংজ্ঞার পেছনের চিন্তা ও চেতনাকে সাজিয়েছেন? আমার মনে হয় কেউই এগুলো চিন্তা করেন না। সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষা ব্যবস্থা ও সেক্যুলার জ্ঞান শাখার দেয়া সংজ্ঞা দিয়েই আমরা এইসব টার্মগুলোকে বুঝি এবং একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করি। সাদেত পার্টিও একই ভুল করেছে। ইসলামিক এপিস্টেমলোজি থেকে বেরিয়ে এসে সেক্যুলার এপিস্টেমলোজিক্যাল টার্মিনলজি দিয়ে নিজেদের সবচেয়ে কাছের পক্ষকে নেতিবাচক ভাবে বিচার করছে।

খেয়াল করে দেখুন, ইসলামিক চিন্তার একটা মৌলিক বিষয় হল- ইহসান। এই ইহসান থেকে বেরিয়ে যিনি চিন্তা করবেন, তিনি কখনই উম্মাহর জন্য সঠিক চিন্তা করতে পারবেন না। তুরস্কের সংকট নিয়েই ভাবুন- দেশটিতে বেকারত্ব, ট্রেড ডেফিসিট, অস্থিতিশীল বিদেশনীতি, ইইউ মেম্বারশীপ এবং জরুরী অবস্থা- এই সমস্যা গুলো কেন সৃষ্টি হয়েছে? এর কি কারণ এটাই যে এরদোয়ান ও তার দল ক্ষমতায় আছেন এবং তারাই এসব সমস্যা গুলো একক ভাবে সৃষ্টি করেছেন? গোটা অঞ্চলে পশ্চিমা আধিপত্য বাদ, বিশ্ব মিডিয়ার সিন্ডিকেট অপপ্রচার, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতাসহ বিশ্ব রাজনৈতিক সংকট কি তুরস্কের পথ চলাকে কোনও ভাবে প্রভাবিত করে নাই? এই প্রভাবের কারণে বেকারত্ব সৃষ্টি হতে পারে না? এর প্রভাবে ট্রেড ডেফিসিট হতে পারে না? বিগত বছর গুলোতে তুরস্ক যেই বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছে সেটার কারণে একজন সাধারণ মানুষও বুঝতে সক্ষম হবেন যে এর একটা প্রভাব সে দেশের অর্থনীতিতে পড়বে। ফলে ট্রেড ডেফিসিট ও বেকারত্ব অনুমিত সমস্যাই ছিল। এখন এটার জন্য একক ভাবে এরদোয়ানকে দায়ী করে সেক্যুলারদের সাথে হাত মেলানো কি ইহসানের মধ্যে পড়ে?

অন্যদিকে তুরস্কের বিদেশ নীতিতে যে তথাকথিত অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে সেটা কি কারণে হয়েছে? বিষয়টাকি এমন যে, এরদোয়ান ও একেপি একাই ব্যাড বয় আর যেসকল অমুসলিম দেশের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে, যারা আন্তর্জাতিক ভাবে বিভিন্ন সংকট তৈরি করে রাজনীতির ঘুটি চেলে সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদারি করেছে তারা সবাই খুবই ভদ্র দেশ? গোটা মিডল ইস্ট জুড়ে যে অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে সেটা কারা করেছে? সেক্যুলাররা নয়কি? সিরিয়ান রেফিউজিরা কি আপনি আপনি দুনিয়াতে পয়দা হয়েছে? আইসিস কি এরদোয়ান বা একেপি সৃষ্টি করেছেন? কাতার ও গলফ কান্ট্রিগুলোর সমস্যা, ইরান, রাশিয়া, ইজরায়েল, আসাদ এগুলো কাদের মাধ্যমে কাদের গেইম প্ল্যানের অংশ হিসেবে জটিলতায় জড়িয়েছে? অস্থিতিশীল বিদেশনীতির জন্য কি এ বিষয়গুলো দায়ী নয়? আবার দেখুন ইইউ মেম্বারশীপের জন্য একটি ইসলামী হয়েও সাদেত পার্টি মরিয়া হয়ে উঠেছে। হাস্যকর বিষয় হল, ইইউ আদৌও তুরস্ক কে ইইউ তে নেবে কিনা তার কোনও ঠিক নেই। অন্যদিকে ইইউ তে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ইসলাম, ইসলামী সংস্কৃতি কিভাবে লাভবান হচ্ছে সেটাও কি তারা বিবেচনা করছেন? ব্যর্থ ক্যু এর পর যে জরুরী অবস্থা বিরাজ করছে সেটাও কি সাদেত পার্টি সঠিক ভাবে এসেস করেছে? মূলত সবগুলো বিষয়েই দেখা যাচ্ছে সাদেত পার্টি সেক্যুলারদের চিন্তাকেই অনুকরণ করে চিন্তাভাবনা করেছে। ইসলামী মানদণ্ডে তারা চিন্তা করেছে বলে আমার মনে হয়নি। কারণ তুরস্ককে খাদের কিনারা থেকে তুলে আনলেন যেই এরদোয়ান, সেই এরদোয়ানই তুরস্ককে ডুবাচ্ছেন এমন ভাবনার আগে এটা দেখার দরকার ছিল যে, বহিরাগত শক্তিরা কিভাবে সে দেশের চলার পথকে বিভিন্ন উপায়ে কঠিন করে তুলছে। পুরো বিষয়টা আমার কাছে এমন মনে হয়েছে যে, বাহির থেকে সেক্যুলার শক্তি গুলো তুরস্কের জন্য কঠিন কঠিন ফাঁদ পেতে রেখেছে আর সে ফাঁদে পড়ে কোনও ভুল হলেই ভেতরের সেক্যুলাররা সেটাকে রাঙ্গিয়ে চাঙ্গিয়ে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। আর দুঃখজনক ভাবে ইসলামী দল সাদেত সেক্যুলারদের ঢোলেই বাড়ি দিচ্ছে।

প্রশ্ন হল, এর কারণ কী? কারণ ইসলামী আন্দোলনের লোকেরা চিন্তা, গবেষণা ও জ্ঞানের ধারা সৃষ্টিতে সচরাচরই পশ্চাৎপদ হয়ে থেকেছে। যার কারণে যখনই পশ্চিমাদের সাম্রাজ্যবাদী জ্ঞান শাখা থেকে মানবতাবাদ, উদারবাদ, সমঅধিকার, শান্তি, মৌলবাদ, টেররিজম, ফ্রিডম অফ স্পীচ…ইত্যাদি টার্মিনলজি সেক্যুলার স্বার্থসিদ্ধির অনুকূলে সংজ্ঞায়িত হয়ে বাজারে এসেছে, তখনই ইসলামী আন্দোলনের লোকেরা কোনও প্রকার চিন্তা গবেষণা ছাড়াই এগুলোকে গ্রহণ করেছে। অন্ধের মতো টার্মিনলজি গুলোর আগে পরে “ইসলামী” শব্দ জুড়ে দিয়ে ভাসা ভাসা কিছু ইসলামী নীতির মধ্যে ফেলে এগুলোকে ইসলামী করণ করে ফেলেছে। কোনও প্রকার গভীর চিন্তা-গবেষণা ছাড়াই এগুলো করা হয়েছে। যার কারণে এগুলোর আগে পরে যতই “ইসলামী” শব্দ লাগানো হোকনা কেন- মৌলিক ভাবে সেগুলো সেক্যুলার এপিস্টেমলজিকেই হৃষ্টপুষ্ট করেছে। আমার অনুমান তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনও একই পথে হেঁটেছে। সেক্যুলাররা যেসকল বিতর্ক টেবিলে এনেছে সে সেসকল বিতর্ককে তারা যাচাই বাছাই ছাড়াই গ্রহণ করেছে। পশ্চিমাদের বিতর্ক গুলো মূলত যে মূল্যবোধ, দর্শন, আদর্শ ও চিন্তা কাঠামোকে প্রতিষ্ঠা করে সেগুলোকে আইডেন্টিফাই করে ইসলামের সাথে এর বৈপরীত্য ও সংঘাতকে কেউ পরিষ্কার করে তুলে ধরতে পারেন নাই। যার কারণে সাদেত পার্টিও সেক্যুলারদের মতো ফ্রিডম অফ স্পীচ, অথোরেটারিয়ান, মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ, ডিক্টেটর ইত্যাদি বলে বলে চিৎকার করে গেছে। তারা একটুও ভাবে নাই যে, সেক্যুলাররা এসব বলতে যা বুঝে এবং বুঝাতে চায়, এবং এগুলোর সেক্যুলার স্ট্যান্ডার্ডের পেছনে যে ধান্দা রয়েছে সেগুলো থেকে মুক্ত হয়ে ইসলাম এসব বিষয়ে কি বলে বা কি অবস্থান গ্রহণ করে সেটা বিবেচনায় এনে পক্ষ নেয়া উচিৎ।

ইসলামী দলগুলো রাজনীতির নীতি নির্ধারণে আরও বেশী হোমওয়ার্ক করা দরকার। সেক্যুলাররা যে ভাবে প্রতিপক্ষকে এটাক করে সেখানে আদল ও ইহসান কোনোওটাই থাকে না। আর প্রতিপক্ষ যদি ইসলাম মনা হয় তাহলে তো কথাই নেই- ইসলাম মনা শক্তিকে দমাতে সেক্যুলাররা তাঁদের আন্তর্যাতিক, আঞ্চলিক ও স্থানীয় সকল এজেন্সির মাধ্যমে বিভিন্ন বিতর্ক, অভিযোগ ও প্রোপাগান্ডা সৃষ্টি করে। তাঁদের এসব বিতর্ক ও অভিযোগ তারা উত্থাপন করে নিজেদের স্টান্ডার্ডে সৃষ্টি করা বিভিন্ন মূল্যবোধ থেকে। যেমন তারা শান্তির নিজস্ব একটা সংজ্ঞা বানিয়ে সারা বিশ্বের উপর আরোপ করেছে। একইরকম ভাবে মানবতা, উদারতা, সুশাসন, প্রগতি, সহনশীলতা, স্বাধীনতা, ফ্রিডম অফ স্পীচ ইত্যাদি বিষয়ের ক্ষেত্রে সেক্যুলারদের নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধ সংজ্ঞা রয়েছে। এগুলোর উপর ভিত্তি করেই তারা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বিতর্ক সৃষ্টি করে এবং অভিযোগ উত্থাপন করে। ইসলামী দলগুলো এই বিষয়গুলোকে নকল করছে। এই অভিযোগ গুলোর উপর ভিত্তি করেই তারা অন্য ইসলাম মনাদেরকে সেক্যুলারদের পক্ষ হয়ে ঘায়েল করছে। বাংলাদেশেও এরা একই কাজ করে। তুরষ্কেও এটাই ঘটেছে। আমার মতে এটা ইসলামী আন্দোলনগুলোর এপিস্টেমলোজিকাল ক্রাইসিস। আল্লাহু আ’লাম।

Facebook Comments

comments