‘সরকারের মধ্যে আরেক সরকার দেশ চালাচ্ছে’

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন দুই দশক যাবৎ। সংগঠনের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন নিজের যোগ্যতা, ত্যাগ আর প্রজ্ঞার বলেই। এ দেশে প্রগতি ধারার ছাত্র রাজনীতির অভিভাবক সংগঠক বলে পরিচিত ছাত্র ইউনিয়নেরও সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতির কারণেই ঢাকা কলেজ থেকে বহিষ্কার হন, রাজনীতির কারণেই জেল খেটেছেন একাধিকবার। স্বাধীনতার পর গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডাকসুর ভিপি (সহ-সভাপতি) নির্বাচিত হন। নেতৃত্ব দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা বাহিনীর।
রাজনীতি, আসন্ন নির্বাচন, জোটভুক্তি এবং কোটা পদ্ধতি নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন সাপ্তাহিক-এর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

সাপ্তাহিক : আসছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন চলমান রাজনীতি?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : দেশে দুই ধরনের রাজনীতি বিরাজ করছে। এর একটি ধারা হচ্ছে হালুয়া-রুটির ভাগবাটোয়ার রাজনীতি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এই ভাগবাটোয়ারার রাজনীতিই এখন মূলধারার রাজনীতি।
অপরদিকে আদর্শবাদী ধারার যে রাজনীতি, তা আপাতত দুর্বল এবং ক্ষয়িষ্ণু প্রায়। রাজনীতি বলতে সাধারণত মানুষ মূলধারাকেই সামনে দেখে এবং এই রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েই স্থির থাকেন। তবে সাধারণেরা আদর্শের রাজনীতি যে একেবারে দেখেন না, তা নয়। কিন্তু আদর্শবাদী রাজনীতির সরব উপস্থিতি না থাকার কারণে মানুষ এখনই কিছু একটা করতে পারবে, তা ধর্তব্যের মধ্যে নেয় না। বিরাজমান রাজনীতির চিত্রের কথা বললাম।

সাপ্তাহিক : ভরসা তো এই মূলধারাতেই?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এই চিত্র চিরদিন একই থাকবে তা মনে করার কোনো কারণ নেই। কেননা রাজনীতির গতিধারায় কখনো কখনো কৃষ্ণপক্ষও দেখা যায় এবং এর আড়ালে আলো থাকে। পরিবর্তন হয়ে এই আলো সামনে চলে আসে।
রাজনীতির হালচাল নিয়ে বলতে হয় মূলধারার রাজনীতিতে এখন পলিটিক্স ঢুকে গেছে। এটিই এখন প্রবাদ। রাজনীতি বলতে সাধারণ মানুষ নীতি বোঝেন, আর পলিটিক্স বলতে বোঝেন এখন নীতিহীন মানুষের রাজনীতি।

সাপ্তাহিক : যারা আদর্শের কথা বলে রাজনীতি করছেন তারা তো দিনকে দিন দুর্বল হচ্ছেন। এই সময়ে তো চ্যালেঞ্জ আরও বাড়ছে আপনাদের জন্য?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : অবশ্যই চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। এটি অপ্রত্যাশিত না। শ্রেণী দ্বন্দ্ব থেকেই এই চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক এবং জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে দুটি শক্তি পরস্পরের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি’র রাজনীতির যে মেরুকরণ তা এই শক্তির ওপর ভর করেই। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি উভয়ই সাম্রাজ্যবাদের অনুসারী। সা¤্রাজ্যবাদ শক্তির পদনত হয়েই উভয় দল ক্ষমতায় আসছে। কোনো আদর্শবাদের ভিত্তিতে তারা ক্ষমতায় আসে না। তারা ক্ষমতায় গিয়ে অবাধে লুটপাট এবং ব্যক্তিগত সম্পদ আহরণ করা যাবে এই মর্মেই ক্ষমতায় যেতে মরিয়া।

বাজার অর্থনীতিই এখন বাজারকেন্দ্রিক রাজনীতি তৈরি করেছে। সা¤্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের অর্থনীতিতে আমাদের এখানে চলছে নয়া উদারনীতির রাজনীতি। এই রাজনীতিই লুটপাটের অর্থনীতি তৈরি করছে। লুটপাটের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত আজকের এই মূলধারার দুটি দল। এই দ্বন্দ্ব যে শুধু আওয়ামী লীগের মধ্যেই, তা নয়। দল দুটির নিজেদের মধ্যেও একই প্রশ্নে দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে। বিএনপি-জামায়াতের হরতাল অবরোধে যত মানুষ মারা গেছে, তার চেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে। একইভাবে মরছে বিএনপি’র মধ্যেও। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এর বহু প্রমাণ রয়েছে।

সাপ্তাহিক : এর দায় তো আপনাদের ওপরেও বর্তায়। আদর্শবাদী সংগঠনগুলোর দুর্বলতার কারণেই হয়তো এমন হিংসার রাজনীতি…
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ইতিহাস সবসময় সমান্তরালভাবে অগ্রসর হয় না। ইতিহাসের পথ আঁকাবাঁকা। রিমোর্ট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পর্দার আড়াল থেকে বাংলাদেশ শাসন করছে সা¤্রাজ্যবাদ । সরকারের মধ্যকার সরকার দেশ শাসন করছে। সাধারণ মানুষের হাতে ক্ষমতার উৎস নেই।

সাম্রাজ্যবাদ এতই ক্ষমতাবান যে সরকারও তাদের সঙ্গে থাকছে, বিরোধী দলও তাদের সঙ্গে থাকছে। এ কারণে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও তাদের স্বার্থে কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। সরকারগুলো লুটপাটের বাধা মোকাবিলায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে চায়। বামপন্থি তথা জনগণের সামনে এই চ্যালেঞ্জ সবসময় ছিল। এ কারণেই চ্যালেঞ্জ আরও বাড়ছে আদর্শবাদী সংগঠনগুলোর কাছে।

সাপ্তাহিক : জনগণকেও সঙ্গে পাচ্ছেন না চ্যালেঞ্জ মোকবেলায়।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় পৃথিবীতে যে ভারসাম্যের শক্তি ছিল, তা এখন নেই। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আবার জনগণের শক্তি যেন অগ্রসর হতে না পারে, এই জন্য সুকৌশলে আমলাতন্ত্রের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে দেয়া আছে। জনগণ চাইলেও কৌশলের কারণে টিকতে পারছে না।

সাপ্তাহিক : সময় এবং বাস্তবতার নিরিখে বামপন্থি ধারার রাজনীতিতেও পরিবর্তন আনা জরুরি ছিল কিনা?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আদর্শবাদী নীতির কোনো পরিবর্তন হয় না। আমরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে যে নীতিতে যুদ্ধ করেছি, একই নীতিতে আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। স্বাধীনতার প্রশ্নে কতবার আঘাত এসেছে! কিন্তু স্বাধীনতার জন্য মানুষ মরিয়া ছিল সবসময়। নতুন কোনো নীতির প্রয়োজন নেই। ১৯৭১ সালে যে নীতির ভিত্তিতে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, সেই নীতির ভিত্তিতেই সমাজ প্রতিষ্ঠা করা আমাদের প্রধান কর্তব্য।

সাপ্তাহিক : আপনাদের আন্দোলনের সতীর্থরাও মিলে যাচ্ছে মূলধারার রাজনীতিতে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টি বা জাসদের মতো দলগুলোর নীতি এখন মিলেমিশে একাকার। নীতির প্রশ্নে কী বলবেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : কে সতীর্থ আর সতীর্থ না, তা নির্ভর করে সে কোন পক্ষে আছেন। যাদের কথা বললেন, তারা আর এখন আমাদের কোনোভাবেই সতীর্থ নন। এক সময় তারা আমাদের সতীর্থ ছিলেন।
নীতির প্রশ্নে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি হচ্ছে সমমনা দল। অথচ সমমনা হওয়া সত্ত্বেও তারা মিলেমিশে দেশ পরিচালনা করতে পারছে না। কারণ লুটপাটের নীতিতে দ্বন্দ্ব অনিবার্য। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি’র মধ্যকার ব্যবস্থাপনাই সংঘাতপূর্ণ নীতিকে সমর্থন করে চলছে। এটি রুগ্ন এবং পশ্চাৎপদ ব্যবস্থাপনা। এই ব্যবস্থাপনায় যারা স্থান পায় বা নিতে চায় তাদেরকে অন্তত সতীর্থ মনে করি না। আত্মোপলব্ধি করে যদি নিজেদের অগ্নিপরীক্ষায় পাশ করে ফিরে আসেন, তাহলে তাদের সাদরে গ্রহণ করে একসঙ্গে কাজ করে যাবো।

সাপ্তাহিক : বাম ঘরানার এই নেতারাও তো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে জোটভুক্ত হয়েছিলেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : জোটভুক্ত হওয়ার সময় তারা বলেছিলেন, আপাতত আমরা গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টি সমাধান করতে চাই। শ্রেণী সংগ্রামের বিষয়টি পরে সুরাহা করা যাবে। আমরা বলেছিলাম, পারবেন না।

সাপ্তাহিক : এখন কী বলবেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ২০০৬ সালের আগে থেকেই জোট নিয়ে কথা হচ্ছিল। ২০১৮ সাল এখন। ১২ বছর আগে যে গণতন্ত্র ছিল এখন তা আরও নাজুক অবস্থায় পড়েছে। গণতন্ত্রহীন শাসন ব্যবস্থার যে প্রক্রিয়া চালু করেছে সরকার, সেই প্রক্রিয়ার অংশ এখন রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনুরাও।

আর রাষ্ট্রীয়ভাবে অসাম্প্রদায়িক ধারা বজায় রাখতে যে চর্চা চলত এখন ধীরে ধীরে তাও বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সরকার সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করছে। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রেখে সরকার তার সাম্প্রদায়িক চরিত্র উন্মোচন করেছে।

সাপ্তাহিক : রাষ্ট্রধর্মের প্রশ্নে রাশেদ খান মেনন এবং হাসানুল হক ইনু বিরোধিতাও করেছিলেন।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : হ্যাঁ, তারা বলেন, রাষ্ট্রধর্ম রাখার সময় আমরা বিরোধিতা করেছিলাম। হ্যাঁ, তারা সংসদে বসেই সামান্য বিরোধিতা করেছিলেন। অথচ এটি ছিল বিভক্তি ভোটের ব্যাপার। নিয়ম হচ্ছে এমন বিষয়ের বিপক্ষে থাকলে সংসদ থেকে বের হয়ে যেতে হয়। তারা বের হননি। তারা সংসদেই বসেছিলেন। বসে থাকার মানে হচ্ছে সমর্থন জানানো। তারাও রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের পক্ষে থাকলেন।

আর এখন যে সাম্প্রদায়িক বীজ বুনন করে চলছে সরকার তাতেও সমর্থন দিচ্ছেন। হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করে সরকার যেসব ভয়ঙ্কর কথা বলছে, তা জামায়াতকেও হার মানাচ্ছে। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সিভিল সার্ভিসে যোগ দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইসলামিকরণে আওয়ামী লীগ বিএনপি’র সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে।

সাপ্তাহিক : এই প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : বঙ্গবন্ধু একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘সেলিম, মুশতাককে খেয়াল রাখবা। ওর মাথায় খালি প্যাঁচ। ওর মাথায় একটি তারকাঁটা ঢুকিয়ে বের করলে স্ক্রু হয়ে যাবে। মুশতাক আমাকে (বঙ্গবন্ধুকে) বলল, ওত ধর্মনিরেপক্ষ ধর্মনিরেপক্ষ করো না, সমাজতন্ত্র সমাজতন্ত্র করো না। একটু মুক্তবাজার নীতিতে দেশ চালাও। আমি মোশতাককে কি জবাব দিয়েছি জানো সেলিম! আমি বলেছি, তোর (মোশতাক) কথা রাখলাম না। আমি সমাজতন্ত্রের পথেই দেশ এগিয়ে নিয়ে যাবো। এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেশ ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতেই এগিয়ে যাবে।’

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর ব্যবস্থাটাই বদলে ফেলা হলো। দেশ মোশতাকের নীতিতে পরিচালিত হতে থাকল। সেই নীতি অনুসৃত হয়েছে জিয়াউর রহমান দ্বারা, এরশাদ দ্বারা, খালেদা জিয়া দ্বারা এবং বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা দ্বারা। আর দুর্ভাগ্য ঠিক এখানেই।

আওয়ামী লীগ ভিশন-২০২১ এবং ভিশন-২০৪১ ঘোষণা করেছে। তা দেখে বিএনপি ঘোষণা করল ভিশন-২০৩০। অথচ বাঙালির শ্রেষ্ঠ ভিশন হচ্ছে ১৯৭১। এই ভিশন বাস্তবায়ন না করে যারা নতুন করে ভিশনের কথা বলেন, ১৯৭১ সালের চেতনার সঙ্গে বেঈমানি করছেন। বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অর্থাৎ ভিশন-৭১ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবেই। জনগণ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির শাসন দেখেছে। ‘নৌকা, লাঙ্গল, পাল্লা, শীষ/ সব সাপেরই দাঁতে বিষ/ তফাৎ খালি ঊনিশ আর বিষ।’

আওয়ামী লীগ হচ্ছে আপদ আর বিএনপি হচ্ছে বিপদ। কোনটাকে বাদ দিয়ে কোনটাকে মূল্যায়ন করব! ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত চুলায় ঝাঁপ দেয়ার মতো। এর বাইরে জনগণের শক্তিকে কেন্দ্রিভূত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্র গড়ার জন্য বিকল্প শক্তি গঠন করতে হবে।

সাপ্তাহিক : এত পোড় খাওয়ার পরেও তো মানুষ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে না। সংশয়টা আসলে কোথায়?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : চেতনা কোনো ইলেকট্রিক সুইচ না। চেতনা বিকশিত হয় ধীরে ধীরে। মানুষ তো সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন করছেন। ফুলবাড়ী কয়লা খনি রক্ষায় রক্ত দিয়েছেন। হাওর এলাকা বাঁচানোর জন্য আন্দোলন হচ্ছে। গার্মেন্টস শ্রমিকরা অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করছেন। আমরা সম্প্রতি কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন দেখলাম। এই আন্দোলনগুলোর নেতৃত্বে বামপন্থিরাই থাকছেন।

অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ে জনগণ বামপন্থিদের ওপর ভরসা করছে। কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রশ্নে তথা রাজনৈতিক চেতনায় বামপন্থিদের ওপর ভরসা না করলে জনগণের অথনৈতিক মুক্তি কোনোদিনই মিলবে না।

সাপ্তাহিক : ‘কোটা’ প্রসঙ্গে বললেন। আপনি রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। কোটা প্রশ্নে আপনার মন্তব্য কী?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আমি কোটা সংস্কারের পক্ষে। কোটা যা আছে আমি তারও বিপক্ষে। আবার কোটা একেবারে তুলে দেয়ারও বিপক্ষে।

সমতার জন্য কোটা রাখা হয়েছে। যারা অতিরিক্ত পিছিয়ে আছে, তারা এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবেন না। যারা বেশি পিছিয়ে আছে, তাদের জন্য অবশ্যই বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে হবে। আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, নারী, জেলা কোটা অবশ্যই রাখতে হবে। এর পক্ষে আমার দৃঢ় অবস্থান।

পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ সৃষ্টি। রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যারা বিশ্বাস করেন তাদের দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা ছিল। ১৯৭১-এর পর তাই করার কথা ছিল। হয়েছে কি, হয়নি, তা নিয়ে আমি এখন আলোচনা করতে চাই না। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির বয়সসীমা পেরিয়ে গেছে। তাদের জনপ্রশাসনে নিয়োগ দেয়া এখন অপ্রাসঙ্গিক।

এই প্রশ্নেই মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান এবং নাতি-পুতিদের কোটায় চাকরি দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এটি ভ্রান্ত ধারণা। কারণ আদর্শ জেনেটিক্যালি পরের প্রজন্মের ওপর ভর করে না। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করবেন, এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। সে স্বাধীনতাবিরোধী মনোভাবও প্রকাশ করতে পারেন। চেতনা অন্যভাবে বিকশিত হয়। ফলে এই যুক্তি এখানে দাঁড় করানো অবান্তর।

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আরেকটি যুক্তি দেয়া হয়। বলা হয়, এত কষ্ট করে তারা যুদ্ধ করেছেন, তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়া উচিত। আমি মনে করি, অবশ্যই তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়া উচিত। তাদের সুবিধা আরও শত জায়গা আছে। সেখানে তাদের সুবিধা দিয়ে সম্মানিত করা হোক। কিন্তু মেধার বাইরে প্রশাসনে ভাগ বসানোর জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি। কোটা ব্যবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মানিত করা হচ্ছে।

এক প্রকার অপমানবোধ কাজ করে যে, মনে হয় সুবিধার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। যেন ভাড়াটিয়া বাহিনী দিয়ে যুদ্ধ করিয়ে নেয়া। ষাটের দশকে আফ্রিকার অনেক দেশেই এমন ভাড়াটে বাহিনীকে দিয়ে যুদ্ধ করা হয়েছে। যুদ্ধ করলেই পয়সা পেত। আমরা কি তাই করেছিলাম?

পাকিস্তান সরকার আমাদের সুবিধা দেয়নি। বাংলাদেশ হলে বিশেষ সুবিধা পাবো, এই ধারণা থেকে কী যুদ্ধ করেছিলাম? আমরা যুদ্ধ করেছিলাম, আদর্শের জন্য। স্বাধীনতার জন্য।

তবে আমি মনে করি, মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষভাবে সম্মান জানাতে হবে। সেটা অন্য পন্থায়। মেধার জায়গায় কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না। দক্ষ এবং যোগ্যরাই প্রশাসনে আসবে এবং রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করবে।

একটি পরীক্ষায় দশ বা বিশ ভাগ বিশেষ সুবিধা থাকতেই পারে। তাই বলে তথাকথিত বিশেষ সুবিধা শতকরা ৫৬ ভাগ হবে আর মেধাসম্পন্নরা মাত্র ৪৪ ভাগ পাবে, এটি তো একটি রাষ্ট্র বা সমাজের নীতি হতে পারে না। ৫৬ ভাগ বিশেষ সুবিধা রেখে মেধাবীদের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করা হয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থা বড় হয় তখন সেটা আর বিশেষ থাকে না। ৪৪ ভাগ হচ্ছে ব্যতিক্রম বঞ্চিত অংশ। ক্ষোভ মূলত এখানেই।

সাপ্তাহিক : সরকারপ্রধান কোটা পদ্ধতি তুলে দেয়ারই ঘোষণা দিলেন। আতঙ্কে আন্দোলনকারীরা।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ছলচাতুরী করে একটি ন্যায্য দাবি কোনোভাবেই ধামাচাপা দেয়া যাবে না। বিশেষজ্ঞ মত এবং সঠিক গবেষণার মাধ্যমে কোটা সমস্যার সমাধান করা সময়ের দাবি। কে জিতল আর কে হারল, সেটা এখানে গুরুত্ব পাওয়ার কথা নয়। যুক্তির জায়গা থেকে বিবেচনা করে এর স্থায়ী সমাধান করা জরুরি।

সাপ্তাহিক : লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপি নেতা তারেক রহমানের পাসপোর্ট জমা দেয়া নিয়ে রাজনীতির নতুন আলোচনা। এটি কীভাবে দেখছেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : দুই বুর্জোয়া দল নিজেদের ঘরের ঝগড়া বাইরে নিয়ে আসে জনগণের মূল দাবি আড়াল করার জন্য। এমন ইস্যু তৈরি করে রাজনীতির বাতাবরণকে একটি মিথ্যা, অবাস্তব, ধোঁয়াশার মধ্যে পতিত করতে চায়। তারেক রহমানের পাসপোর্ট ইস্যুও ঠিক তাই।

এরকম ইস্যু আগেও তৈরি করা হয়েছে। এগুলো আমাদের কোনো আগ্রহ কাজ করে না। কারণ এই জগৎ আমার জগৎ নয়। তবে এতটুকু বুঝতে পারছি, দুই দলের কেউই সত্যটি বলছে না। আওয়ামী লীগ ধোয়া তুলসী পাতা না আবার বিএনপিও ধোয়া তুলসী পাতা না। হাওয়ার ভবনের খবর সবাই জানি। বিএনপির কর্মীরাও আমার হাত ভেঙে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের কর্মীরাও হাত ভেঙে দিয়েছে।

বিএনপি-আওয়ামী লীগের এসব ঠুনকো ইস্যু আমাদের কাছে গুরুত্ব পায় না। জনগণের অধিকার ধামাচাপা দেয়ার জন্যই এমন হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। পুঁজিবাদের জন্য না। পাকিস্তানের গোলামি থেকে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছিল ভারত বা আমেরিকার গোলামির জন্য না।

সমাজের কেউ নিরাপদ নন। সবদিকেই খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, দুর্নীতি। বঙ্গবন্ধু সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় থেকে যতবার বক্তব্য দিয়েছেন, তার বেশির ভাগ বক্তব্যেই বলেছেন, দসবাই পায় সোনার খনি আর আমি পেয়েছি চোরের খনি। সাড়ে সাত কোটি কম্বল আনলাম। আমার কম্বল গেল কই?’

বঙ্গবন্ধু সবসময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ তারই দল এবং কন্যা আজ ক্ষমতায়। কম্বল চুরি নয়, হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে। লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টু শব্দটি করছেন না। অথচ পিতার কাছ থেকে কন্যার শিক্ষা নেয়ার কথা ছিল।

সাপ্তাহিক : আসন্ন সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন কীনা?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ থাকবে কীনা, তাই ভাবছি।

সাপ্তাহিক : গতবার সুযোগ ছিল। অংশ নেননি।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : গতবারের নির্বাচনের বিষয় আলাদা। সবাই তার প্রেক্ষাপট জানেন।
শতকরা ৯০ ভাগ প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দেয়া হবে বলেই ধারণা করা যাচ্ছে। জামানতের টাকা বাড়িয়ে ৫০ হাজার করা হচ্ছে। আবার ভোটার তালিকার একটি সিডি নেয়ার জন্য ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেতমজুর জীবনেও এত টাকা একসঙ্গে দেখেননি। এত টাকা ৯০ ভাগ মানুষের কাছে কল্পনার বিষয়। অর্থাৎ ৯০ ভাগ মানুষকে নির্বাচনের বাইরেই রাখার পরিকল্পনা হচ্ছে।

বড়লোকরাই প্রার্থী হতে পারবেন এবং আমজনতা কোন কোটিপতি দ্বারা প্রভাবিত হবেন তাই নির্ধারণ হবে নির্বাচনে। এটিকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলে না। সবাই ভোট দিতে পারলেই তাকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলে না। ভোটারদের যেমন ভোট প্রয়োগের সুবিধা দিতে হবে এবং প্রার্থীকেও।

সাপ্তাহিক : আপনারা এর প্রতিবাদ করেননি?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : হ্যাঁ, বলেছিলাম। নির্বাচন কমিশন যুক্তি দিয়ে বলেন, জামানত না বাড়ালে প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হয়ে যায়। বেশি সংখ্যক প্রার্থী হলে ব্যালটে জায়গা দেয়া নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি হয়।

সাপ্তাহিক : আপনারা কী বললেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আমরা বলেছি, প্রার্থীর আয়ের উপর জামানত নির্ধারণ করেন। তখন তারা থমকে গেলেন। জবাব দিলেন না।

রাষ্ট্র ব্যবস্থাগত বাস্তবতা এমনভাবে তৈরি করে রেখেছে, যেখানে সাধারণ মানুষের অধিকার শুধু খর্বই করা হচ্ছে। কাগজে লেখা আছে, সকলের অধিকার সমান। তবে এই এই শর্ত প্রযোজ্য।

সাপ্তাহিক : নির্বাচন নিয়ে আপাতত কী ভাবছেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ এবং নিরপেক্ষ হওয়ার জন্য আমরা আন্দোলন করে যাচ্ছি। আমরা মাঠে আছি। ১৮ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে সারা দেশে পদযাত্রা হবে। এরপর জাতীয় সম্মেলন হবে। নির্বাচন কমিশন ঘেরাওয়ের কর্মসূচি আছে।
যদি আমাদের দাবি মানা না হয় তাহলে আগামী নির্বাচনে শামিল হবো কি হবো না, তা পরবর্তীতে বিবেচনা করে দেখবে। তবে আমরা যদি এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি, তাহলে আর দ্বিমুখী নির্বাচন হবে না। আমরা বামপন্থিরা বিকল্প বলয় গড়ে তুলে আওয়ামী লীগ-বিএনপির শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করব।

সাপ্তাহিক : কোনো জোটভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা আছে কিনা?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সিপিবি এবং বাসদ জোট তো আছেই। নির্বাচনের আগে আরও কোনো শক্তির সঙ্গে আসন নিয়ে বোঝাপড়ার দরকার হলে সেটাও বিবেচনা করব।

সাপ্তাহিক : আওয়ামী লীগ বা বিএনপি জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কোনো ভাবনা আছে কীনা?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আওয়ামী লীগ-বিএনপি জোটে শরিক হওয়া অসম্ভব। আমাদের আন্দোলনই হচ্ছে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নীতির বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি মিলে জোট করতে পারে। আমরা তাদের সঙ্গে জোট করব! কল্পনাতেই আসে না।

অনেকেই বলে সিপিবিও বিরোধী দল, বিএনপিও বিরোধী দল। তাহলে জোট হতেই পারে। বিএনপি আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করে ডানপন্থা অবস্থান থেকে। আর আমরা বিরোধিতা করি বামপন্থা অবস্থান থেকে। একই অবস্থান থেকে বিএনপিরও বিরোধিতা করি। এই প্রশ্নেই আওয়ামী লীগ বা বিএনপি’র সঙ্গে আমাদের কোনো ঐক্য হবে হবে না।

সূত্র: সাপ্তাহিক

Facebook Comments

comments