বিএনপির লক্ষ্য অক্টোবর, প্রস্তুত হচ্ছে জামায়াতও

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে ভিন্ন পরিকল্পনায় এগোচ্ছে বিএনপি। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জেলে থাকবেন, নাকি বাইরে থাকবেন সেটা মুখ্য বিষয় নয়, তাদের লক্ষ্য এখন সরকারের ‘পতন’। নেতাদের ভাষ্য, খালেদা জিয়া জেলে থাকলে বিএনপি পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে না, এমনকি তিনি মুক্তি পেলেও শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে তারা অংশ নেবেন না।

বিএনপির বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা প্রিয়.কমকে তাদের এমন মনোভাবের কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য মতে, তারা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হলেই কেবল নির্বাচনে যাবেন।

বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবি করে আসছে। এবার নেতারা বলছেন, আন্দোলনের মাধ্যমেই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থার উদ্যোগ নিতে সরকার বাধ্য হবে। সে জন্য প্রয়োজনীয় আইন পরিবর্তন তাদেরকেই করতে হবে। দাবি মেনে নেওয়া মানেই তো তারা (সরকার) আইন পরিবর্তন করে দাবি মেনে নেবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু প্রিয়.কমকে বলেন, ‘রাজনীতিতে অসম্ভব বলে কিছু নেই। দাবি আদায়ে সমঝোতা কিংবা আন্দোলন—দুটোই হতে পারে। আমরা (বিএনপি) নির্দলীয় সরকারের অধীনে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নির্বাচনে যাব। তার জন্য যদি সরকারের পতন ঘটাতে হয়, তাহলে তা-ই ঘটানো হবে। সেই নির্বাচনি পরিবেশ সৃষ্টি করতে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথের লড়াই—উভয় লড়াইয়ে বিজয়ী হবো বলে আশাবাদী।’

এর আগে ২০০৬ সালের অক্টোবরে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক জোট লিপ্ত হয়েছিল প্রাণঘাতী সংঘাতে। ওই সময় বিচারপতি কে এম হাসান যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগ না পান, সে জন্য আওয়ামী লীগ আন্দোলনের ডাক দেয়। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার ডাকে আওয়ামী লীগ কর্মীরা বৈঠা-লগি নিয়ে আন্দোলনে নেমে পড়েন। ২৮ অক্টোবর সারা দেশে সহিংসতায় ১৮ জন নিহত হন। ঢাকার পল্টন, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে ৫ জন নিহত হন। পুরানা পল্টন এলাকায় প্রকাশ্যে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করে লাশের ওপর নাচার ঘটনাও ঘটে।

বিএনপি অক্টোবর মাসকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করায় ১২ বছর আগের সেই সংঘাতময় পরিস্থিতির শঙ্কা জেগে উঠেছে। দুই পক্ষই মনে করছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলে তাদের কঠিন সংকটের মধ্যে পড়তে হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘২০০৬ সালে ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের মধ্যে যে তেজ ছিল সেটা এখন আর নেই। বরং ২০১৮ সালের অক্টোবর হবে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর মাস।’

অক্টোবরকে সামনে রেখে বিএনপি এরই মধ্যে তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সারা দেশে সংগঠনটির মেয়াদহীন কমিটিগুলো পুনর্গঠনের নির্দেশনা দিয়েছে। তবে নীতি নির্ধারণী ফোরামের নেতাদের বক্তব্য হচ্ছে, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া-না-নেওয়া নিয়ে এখনো দোটানায় দল। দলটির সিদ্ধান্ত, জাতীয় নির্বাচন হতে হবে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। একই সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেও মিথ্যা মামলায় কারান্তরীণ থেকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। দলীয় সরকার এবং শেখ হাসিনার অধীনে দেশে নির্বাচন হবে না। অন্যথায় জাতীয় নির্বাচন ফের বয়কট করবে, নাকি অংশ নেবে সে বিষয়ে দেশের অন্যান্য গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে পরবর্তীতে ভিন্ন কৌশলে অগ্রসর হবে বিএনপি।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান প্রিয়.কমকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীনরা যতই উল্টাপাল্টা কথাবার্তা বলুক না কেন, শেষ পর্যন্ত তারা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে এবং বিএনপিও সেই নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে এবং সেটা হবে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে তারেক রহমানের পরামর্শে। এমনটা টার্গেট করেই সাংগঠনিকভাবে দল গুছিয়ে এগুচ্ছে বিএনপি। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারান্তরীণ থাকায় কমিটি পুনর্গঠন কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই প্রক্রিয়া আবার শুরু হয়ে চূড়ান্ত করা হয়েছে। স্বল্প সময়ে সারা দেশের মেয়াদহীন কমিটি গুলো পুর্নগঠন করা হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে শাহজাহান বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তি বিএনপির আন্দোলনের শক্তি। তাই স্বাভাবিকভাবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন আদায়ে আমরা শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করব। পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং সময় বলে দিবে বিএনপির সরকার পতনের আন্দোলন কী রূপ নেবে।’

সূত্র মতে, জাতীয় নির্বাচনের আগ মুহূর্তে একাধিক সিটি করপোরেশন নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও বিএনপি মূলত খালেদা জিয়ার মুক্তি ও পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ছাড়া কোনো কিছু নিয়ে আপাতত ভাবছে না। তবে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মতো অন্যান্য সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে—এমনটা সংশয় থাকলেও প্রতিটি সিটি নির্বাচনে অংশ নেবে দলটি। উদ্দেশ্য দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশন ও সরকার নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারার বিষয়টিকে আরও সামনে তুলে নিয়ে এসে মূল দাবিতে অনড় থাকা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রিয়.কমকে বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আন্দোলন একইসঙ্গে দুই ইস্যুতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। নিকট-অতীত ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অগ্রসর হতে চায় দল। সে জন্য ক্ষমতাসীনদের এই মুহূর্তে ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচির চাপে রেখে লক্ষ্য অর্জনকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ শুধু বিএনপি নয়, জনগণ চায় সরকারের পরিবর্তন, তবে বিএনপি মনে করছে সেই পরিবর্তন হবে নির্বাচনের মাধ্যমে। যেহেতু দলটি নির্বাচনমুখী রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। তা ছাড়া একাদশ নির্বাচনের জন্য সময় খুব একটা বেশি নেই। কাজেই ছাড় দেওয়ারও সুযোগ নেই। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকার বিএনপিকে পাশ কাটিয়ে চলতে সময় পাবে। এরপরে রাজপথের আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাসীনরা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিএনপি একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হিসেবে দেখছে। কিন্তু সরকার যদি সে পথে না হাঁটে, তাহলে গণ-অভ্যুত্থান ঘটানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে দলটির নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন, দাবি আদায়ে সরকার পতনে অসহিংস আন্দোলন প্রয়োজনে সহিংস আন্দােলনে রূপ নেবে।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান প্রিয়.কমকে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার সাময়িক অনুপস্থিতিতে মুক্তির দাবিতে ঢিলেঢালা কর্মসূচি হচ্ছে মূলত “ওয়ার্ম আপ’’। বৃহত্তর কর্মসূচির জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করা, সংগঠিত করাটাই আসল উদ্দেশ্য। ইতোমধ্যে ভেতরে ভেতরে সেই লক্ষ্য অনেকটাই অর্জিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তাই সরকারকে একটি যৌক্তিক নির্বাচনের জন্য চাপে রাখার পাশাপাশি দল গোছানো—দুটোই একসঙ্গে সেরে নিচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড।

মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। সে জন্য সেপ্টেম্বর মাস পযন্ত পুরো ওয়ার্ম আপ কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে শেষ হবে। চূড়ান্ত লক্ষ্য সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে। আর সে জন্য বেশ কিছু তৈরি করে রাখা হচ্ছে। নির্বাচনি আমেজ শুরুতে আন্দােলনের পাশাপশি ক্ষমতাসীনদের প্রতিটি সেক্টরের অনিয়ম দুর্নীতির চিত্র শ্বেতপত্র আকারে দেশে-বিদেশে একযোগে প্রচার করা হবে। ফলে তাদের পক্ষে শত চেষ্টা করে বিএনপিকে বাইরে রেখে পুনরায় ৫ জানুয়ারির ঘটনা ঘটানো সম্ভব হবে না। কারণ তখনকার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতি এক নয়। সরকার ভেতরে বেতরে নানামুখী সংকটের মুখোমুখি, যা ওই সময়ে ছিল না।

জামায়াত ইসলামীর একটি সূত্র মতে, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী, যদিও এর আগেও বিভিন্ন সময়ে জামায়াত মাঠে নেমে আন্দোলন চাঙ্গা করতে চেয়েছিল কিন্তু বিএনপি তথা বিরোধীদলীয় নেত্রীর অনাগ্রহের কারণে তা তেমন কোনো মাত্রা পায়নি। কিন্তু এই মুহূর্তে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলের লক্ষ্য এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। সে কারণে সরকারের বিরুদ্ধে সমুচিত জবাব দিতে প্রস্তুত হচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন শরিক দল জামায়াত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে দিতে ব্যাপক প্রচারণায় নেমেছে ক্ষমতাসীনরা। উদ্দেশ্য বিরোধী দল যাতে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারে। কারণ দেরিতে হলেও আওয়ামী লীগের একটি দায়িত্বশীল মহল মনে করছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকা ছাড়া রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের তেমন একটা লাভ হয়নি। বরং জনগণের কাছে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্য মজার বিষয় হচ্ছে, সরকার পক্ষ ও সরকারবিরোধী জোট—উভয়ই নিজেদের সফল মনে করছে। যদিও সমঝোতার পরিবর্তনে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির ক্রমাগত পরস্পরবিরোধী অবস্থান সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছে না। শুধু তা-ই নয়, সাধারণ মানুষের মাঝে এমন ধারণাও সৃষ্টি হয়েছে যে, রাজধানী ঢাকা ছাড়া অন্যত্র সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা অনুপস্থিত।

নাম প্রকাশে অনিইচ্ছুক দলটির একজন ভাইস চেয়ারম্যান প্রিয়.কমকে বলেন, ‘এখন হয়তো দেশে থাকতে পারলেও আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পতন ঘটাতে না পারলে নির্বাচন দূরের কথা পরবর্তীতে বিএনপির নেতাকর্মীরা দেখা যাবে দেশেই থাকতে পারবে না। তাই দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া বিএনপিকে সর্বশক্তি দিয়ে এবার মাঠে নামতে হচ্ছে। আন্দোলনে মরণ কামড় দেওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। কারণ এটাই হয়তো নেতাকর্মীদের অন্তত প্রাণে বেঁচে যাওয়ার শেষ সুযোগ।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর, খালেদা জিয়ার সাময়িক অনুপস্থিতি বিএনপির নিষ্ক্রি থাকা নেতাদের সক্রিয় করে তুলেছেন। তারা মনে করছেন, এবার সক্রিয় না হলে ভবিষ্যতে দলে তাদের ভাগ্য অন্যভাবে নির্ধারণ করা হবে। কাজেই প্রায় সব নেতাই নিজেদের সাংগঠনিক শক্তিকে আসছে অক্টোবর পুরোপুরি কাজে লাগানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছেন।

এদিকে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য প্রিয়.কমকে বলেন, ‘গণরোষ থেকে কোনো বিস্ফোরণের জন্ম হয় কি না—এই আতঙ্কে সরকার ও দলীয় রাজনীতিবিদরা। আর তাই আন্দোলনের নামে বিরোধী দলের যেকোনো নৈরাজ্য, সংঘাত, সংঘর্ষ মোকাবেলায় দেশব্যাপী দলীয় নেতাকর্মীদের শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার চূড়ান্ত পরিকল্পনা নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। বিরোধী দলের আন্দোলন ঠেকাতে ঘরে-বাইরে প্রস্তুতি চলছে।

সূত্র: প্রিয় ডটকম

Facebook Comments

comments