বাংলাদেশি বিজ্ঞানী জামাল নজরুল, কতটুকু জানেন তার সম্পর্কে?

শফিকুল ইসলাম

প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে যা দিয়ে সেই জাতিকে চেনা যায়। বাঙালীর জন্য যে উপমাটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত তা হলো ‘বাঙালী আবেগপ্রবণ জাতি’। আবেগপ্রবণতার সাথে যুক্তিশীলতার সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। তাইতো ‘বাঙালী যুক্তিশীল জাতি’ এমন কথা ভুলেও শোনা যায় না। এদিকে যুক্তিশীলতার সাথে বিজ্ঞানমনস্কতার বন্ধুত্ব চিরকালীন। যে সমাজে যুক্তিশীলতা স্থান পায় নি সেই সমাজ বিজ্ঞানমনস্ক নয়। বিজ্ঞানের অগ্রগতি সেখানে আশা করা যায় না।

একটি স্কেল দিয়ে এক জাতের জিনিস পরিমাপ করা যায়, অন্য জাতের জিনিস পরিমাপের জন্য অন্য স্কেল প্রয়োজন। এক জাতের স্কেল দিয়ে অন্য জাতের জিনিস পরিমাপ করা যায় না। উদাহরণ দিয়ে বলা যাক। দৈর্ঘ্য মাপার জন্য স্কেল আর তাপমাত্রা মাপার জন্য থার্মোমিটার প্রয়োজন একথা আমরা সবাই জানি। এখন কেউ যদি থার্মোমিটার দিয়ে দৈর্ঘ্য কিংবা স্কেল দিয়ে তাপমাত্রা পরিমাপ করতে চায় তবে তাতে প-শ্রম ছাড়া আর কিছুই হবে না। বাঙালীর জন্যও এই কথাটি খাটে। ‘বাঙালী আবেগ প্রবণ জাতি’ কিংবা ‘বাঙালী অতিথিপরায়ন’ এমন কোনো অভিধা দিয়েই বাঙালীর যুক্তিশীলতা কিংবা বিজ্ঞানমনস্কতার মাত্রা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। আর যে সমাজে যার কদর বেশি সেই সমাজে সেই জাতের পণ্য উৎপাদন বেশি হবে এতো অর্থনীতির সাধারণ সূত্রের কথাও।

কাজেই আবেগপ্রবণ বাঙালী জাতির মধ্যে বড়ো মাপের কোনো যুক্তিশীল মানুষ কিংবা বড় মাপের একজন বিজ্ঞানী পাওয়া যাবে এমনটা কেউ আশা করে না। সেই হিসেবে বাংলাদেশের বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম একজন বিশ্বমানের বিজ্ঞানী একথা শুনতে আমাদের কানও যেন অভ্যস্ত নয়। তাছাড়া সকলেই জানে যে অনুচিত জিনিসের খুব বেশি কদর কোনো সমাজেই থাকে না। তাই ‘বাংলাদেশের বিজ্ঞানী’ জামাল নজরুল ইসলামেরও খুব একটা কদর ছিল না এই সমাজে। কিংবা কথাটিকে একটু সংশোধন করে বলা চলে জামাল নজরুল ইসলামের মতো একজন বিজ্ঞানীকে আপন করে নেয়ার, কিংবা মূল্যায়ণ করার উপযুক্ত মানুষের সংখ্যাও খুব বেশি নেই আমাদের সমাজে।

তাইতো জামাল নজরুল ইসলামের নাম খুব একটা শ্রুত নয় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে। আর যারা তার নাম জানেন তাদেরও খুব কম সংখ্যকই তাঁর কাজ কর্মের সঠিক হদিস রাখেন। তাঁর সম্পর্কে যারা জানেন তাদের অনেকেই কেবল এইটুকু জেনেই তুষ্ট হন যে তিনি অনেক বড় বিজ্ঞানী, তিনি স্টিফেন হকিং এর বন্ধু ছিলেন। আর তিনি ক্যাম্ব্রিজের দুই লাখ টাকার চাকুরি ছেড়ে বাংলাদেশে এসে তিন হাজার টাকার চাকুরি করতে এসেছেন। ব্যাস। হয়ে গেল জামাল নজরুল ইসলাম সম্পর্কে জানা। জামাল নজরুল ইসলাম কী করেছেন, কী তাঁর আবিষ্কার, কী তাঁর অবদান এ সম্পর্কেও খুব কমই আমাদের জানা।

জামাল নজরুল ইসলাম শিক্ষাজীবনের চট্টগ্রাম, কলকাতা এবং পশ্চিম পাকিস্তানে স্কুল ও কলেজ জীবন কাটিয়ে বিশ্বখ্যাত ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেন। এ সময়েই (১৯৫৯ সালে) একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্বের উপর প্রবন্ধ লিখে তিনি লাভ করেন ‘বেল ম্যাথমেটিকাল পুরস্কার’। সেই থেকে একে একে প্রায় সত্তরটি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে।
একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্ব পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিলতম অসম্পূর্ণ একটি তত্ত্ব। পৃথিবীর সেরা সব বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে কাজ করে চলেছেন দীর্ঘদিন ধরে। এই কাজ আংশিকভাবে সম্পন্ন করে (দূর্বল বলের সাথে বিদ্যুৎচেীম্বকীয় বলের একত্রিকরণ) খ্যাতিলাভ করেন বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম, স্টিভেন ওয়াইনবার্গ এবং শেলডন গ্লাসো। কিন্তু এখনও অনেক পথ বাকী। সেই বাকী পথ পেরোতে জামাল নজরুল ইসলাম নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে গিয়েছেন। ধারণা করা হয় এই তত্ত্ব আবিষ্কৃত হলে মহাবিশে^র ভূত-ভবিষ্যত সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা যাবে।

ছোটোবেলা থেকেই মহাবিশ্বের ভবিষ্যত জানার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল জামাল নজরুল ইসলামের। এক ঘরোয়া বৈঠকে জামাল নজরুল ইসলাম স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘তখন আমি কলকাতায় থাকি। বয়স নয় বছর। হঠাৎ একদিন গভীর রাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। বিছানায় উঠে বসে ভাবতে লাগলাম, এই পৃথিবী এবং এই বিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হলো? এটা কত বড়? এর পরে কী? এরকম নানা প্রশ্ন আমার মনে উদয় হতে লাগল। সে রাতে আর ঘুমাতে পারিনি। শুধু চিন্তা করছিলাম।’

বলা বাহুল্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন অগণিত চিন্তাশীল মানুষ এই চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন, এখনও কাটাচ্ছেন। কিন্তু এখনও এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর মেলেনি। জামাল নজরুল ইসলাম এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। ‘মহাবিশ্বের চুড়ান্ত পরিণতি’ (The ultimate fate of the universe) শিরোনামে তিনি লিখেছেন একটি অসাধারণ বই। ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে বইটি প্রকাশিত হয়েছে ১৯৮৩ সালে। এর আগে, ১৯৭৭ সালে রয়েল এস্ট্রনমিকাল সোসাইটির জার্নালে তিনি লিখেন একটি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ Possible Ultimate Fate of the Universe ।

‘আল্টিমেট ফেট অব দ্যা ইউনিভার্স’বা ‘মহাবিশ্বের চুড়ান্ত পরিণতি’ শিরোনামে তাঁর এই বইটি যখন প্রকাশিত হয় তখন এ বিষয়ে খুব বেশি বই ছিল না। স্টিফেন হকিং-এর দুনিয়া কাঁপানো বই ‘সময়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ (A Brief History of Time) রচিত হয় ১৯৮৮ সালে, আর স্টিভেন ওয়াইনবার্গের বিখ্যাত ‘প্রথম তিন মিনিট: মহাবিশ্বের জন্ম ইতিহাস সম্পর্কে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি’ (The First Three Minutes: A Modern View of the Origin of the Universe) প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে। উল্লেখ্য এ বছরই প্রকাশিত হয়েছিল জামাল নজরুল ইসলামের বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ Possible Ultimate Fate of the Universe । এটি ছিল অত্যন্ত টেকনিকাল একটি প্রবন্ধ। স্টিভেন ওয়াইনবার্গের ‘প্রথম তিন মিনিট: মহাবিশে^র জন্ম ইতিহাস সম্পর্কে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি’ বইয়ে মহাবিশ্বের শুরুর দিককার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এ বই থেকেই জামাল নজরুল ইসলাম অনুপ্রেরণা লাভ করেন মহাবিশ্বের পরিণতি সম্পর্কে একটি জনপ্রিয় বই রচনার। এর আগে অবশ্য হয়ে অনুরুদ্ধ হয়ে এ বিষয়ে একটি জনপ্রিয় প্রবন্ধ রচনা করেন স্কাই এন্ড টেলিস্কোপ ম্যাগাজিনের জন্য।

‘মহাবিশ্বের চুড়ান্ত পরিণতি’ গ্রন্থটি মহাবিশ্বের ভুতভবিষ্যত বিষয়ে একটি আকর গ্রন্থ। বিজ্ঞান গ্রন্থের একটি বৈশিষ্ট্য হলো এমন যে কয়েক বছরের মধ্যেই তা সাধারণ জ্ঞানে পরিণত হয়ে যায়, তা সে যত জটিল বিষয়ই হোক না কেন। কোপার্নিকাসের ‘অন দ্যা রিভোলুশন, গ্যালিলিওর ‘দুটি প্রধান বিশ্ব পদ্ধতি সম্পর্কিত সংলাপ’ কিংবা আইনস্টাইনের ‘থিউরি অব রেলেটিভিটি’ যাই হোক না কেন। এসকল গ্রন্থ যখন প্রকাশিত হয় তখন খুব বেশি মানুষ এ বিষয়ে অবগত ছিল না। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তা মানুষের সাধারণ জ্ঞানে পরিণত হয়। জামাল নজরুল ইসলামের ‘মহাবিশ্বের চুড়ান্ত পরিণতি’ গ্রন্থের জন্যও এ কথা খাটে। এ বইটি যখন প্রথম প্রকাশিত হয় তখন এ বিষয়ে মানুষের জ্ঞান ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু হাল আমলে এই বইয়ের অধিকাংশ বিষয়ই হয়তো সাধারণ জ্ঞানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তাই বলে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে এই বইয়ের গুরুত্ব কমে যায়নি।

ভূমিকা থেকে উপসংহার পর্যন্ত মোট পনেরটি অধ্যায় রয়েছে এ বইয়ে। অধ্যায়গুলো হলো যথাক্রমে ১। ভূমিকা ২। আমাদের গ্যালাক্সি ৩। মহাবিশ্বের বৃহৎ পরিসরে গঠন ৪। প্রাথমিক কণা – একটি প্রাথমিক অবয়ব ৫। মহাবিশ্ব কি মুক্ত না বদ্ধ ৬। নক্ষত্রের মৃত্যুর তিনটি উপায় ৭। কৃষ্ণবিবর এবং কোয়াসার্স ৮। গ্যালাক্টিক এবং সুপার গ্যালাক্টিক কৃষ্ণবিবর ৯। একটি কৃষ্ণবিবর চিরকালের নয় ১০। ধীর এবং সূক্ষ্ম পরিবর্তন ১১। ভবিষ্যত জীবন এবং সভ্যতা ১২। একটি পতনশীল মহাবিশ^ ১৩। অবিচল অবস্থা তত্ত্ব ১৪। প্রোটনের স্থায়িত্ব এবং সবশেষ ১৫। উপসংহার।

বাঙালীর ইংরেজি যেমন হয়, অনেকটা কষা ধরনের, তেমন নয় বরং বইটি অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় রচিত। পড়তে গিয়ে বোঝার উপায় নেই যে একজন অ-ইংরেজের রচনা এটি। বইটির প্রাককথনে লেখক বলেন, ‘আমি বইটি তাদের জন্য রচনা করেছি যাদের বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান নেই।’ কিন্তু জনপ্রিয় করতে গিয়ে এতে তিনি তত্ত্ব এবং তথ্যের সাথে কোনো আপোস করেন নি। বরং তিনি চেষ্টা করেছেন বিজ্ঞানের জটিল ও টেকনিকাল বিষয়গুলোকে সহজ সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করতে।

ভূমিকাতে বইয়ের সমগ্রটার উপরেই চোখ বুলানোর মতো করে একটু ধারণা দেওয়া হয়েছে। আমাদের গ্যালাক্সি অধ্যায়ে গ্যালাক্সি বলতে কি বোঝায় সে সম্পর্কে জানা যাবে। এর সাথে জ্যোতির্বিজ্ঞানের কিছু সাধারণ পরিমাপবিধি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে এবং গ্যালাক্সির আকার, আকৃতি, বৈশিষ্ট্য, একএকটি গ্যালাক্সিতে নক্ষত্রের আনুমানিক সংখ্যা ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় অধ্যায়ে মহাবিষ্ফোরণ থেকে আমাদের এই মহাবিশ্বের বর্তমান অবস্থায় আসার কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে অত্যন্ত সুন্দরভাবে। মহাবিশ্বের বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করবে এর ভবিষ্যৎ। আমাদের এই মহাবিশ্ব কি মুক্ত না বদ্ধ? মূলত এই প্রশ্নের উত্তরের উপরেই নির্ভর করবে মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি। মহাবিশ্ব মুক্ত না বদ্ধ এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। এই প্রশ্নে বিশ্বের তাবৎ বিজ্ঞানীরা এখনও বিভক্ত। পঞ্চম অধ্যায়ে এ সম্পর্কে মজার আলোচনা আছে। তবে এই অধ্যায়ে প্রধানত মুক্ত মহাবিশ্বের ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আর বদ্ধ মহাবিশ্ব নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে দ্বাদশ অধ্যায়ে। মহাবিশ্ব বদ্ধ হলে কী ঘটবে? যেমন করে একটি মহাবিষ্ফোরণের মাধ্যমে এই মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে, এর বিপরীতে এই মহাবিশ্ব মহাসংকোচনের মাধ্যমে তার পরিণতি লাভ করবে। এক কথায় শূন্য থেকে যার আগমণ, শূন্যেই তার সমাপ্তি। তবে এর বাইরেও তত্ত্ব আছে। অবিচল অবস্থায় মহাবিশ্ব কেমন পরিণতি লাভ করবে সে বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা আছে ত্রয়োদশ অধ্যায়ে। তবে জামাল নজরুল ইসলামের যুক্তি ও জ্ঞান তাঁকে মুক্ত মহাবিশ্বের পক্ষেই রেখেছেন শেষ পর্যন্ত।

প্রতিটি গ্যালাক্সির প্রধানতম উপাদান হলো নক্ষত্র। কী করে নক্ষত্র জন্ম নেয়? কী করে এরা জীবন কাটায়। এর শেষ কোথায়? এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আছে ষষ্ঠ অধ্যায়ে। এই অধ্যায়ে নক্ষত্রের মৃত্যুর তিনটি উপায় বর্ণিত হয়েছে। আমাদের সূর্যের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বা তারচেয়ে বড় নক্ষত্রের পরিণতি হলো ব্লাকহোল বা কৃষ্ণবিবর। এই কৃষ্ণবিবর নিয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচনা আছে সপ্তম অধ্যায়ে। কী হবে যদি আকাশের সব তারা নিভে যায়? প্রশ্নটি কাব্যিক শোনালেও বিজ্ঞানীরা ভেবেছেন এ নিয়ে বিজ্ঞানীর মতো করেই। কৃষ্ণবিবর, আন্তগ্যালাক্টিক কৃষ্ণবিবর নিয়ে আলোচনা আছে পরবর্তি তিনটি অধ্যায়ে।

মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ কী? এমন হতে পারে বিবেক বর্জিত মানুষেরা নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই ডেকে আনলো। ভয়ঙ্কর পারমাণবিক যুদ্ধের মাধ্যমে সূর্যের সকল আলো নিভে যাওয়ার অনেক আগেই এই পৃথিবীর ধ্বংস ডেকে আনবে কিছু দুষ্ট মানুষের দল। কিন্তু বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম আশাবাদী। তিনি আশা করেন মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। কিন্তু বিজ্ঞানীর শংকা তাতেও কাটে না। আমাদের এই সূর্যটি যখন শ্বেত বামনে রূপ নেবে তখন সূর্যের আলো কমে যাবে। মানুষ পর্যাপ্ত শক্তি পাবে না। তার আগে যখন সূর্য আকারে অনেক বড়ো হতে হতে লোহিত জায়ান্টে পরিণত হবে তখন এই পৃথিবীর তাপমাত্রা এত বেড়ে যাবে যে এই পৃথিবী মানুষের বাসের অনুপযুক্ত হয়ে যাবে। বিজ্ঞানী ইসলাম আশা প্রকাশ করেন এর আগেই মানুষ অন্য কোনো গ্রহে পারি জমাবে। আর যখন আমাদের সূর্যের সকল আলো নিভে যাবে তার আগেই মানুষ আন্ত নাক্ষত্রিক গ্রহে পারি জমানোর কৌশল আয়ত্বে নিয়ে আসবে। কিন্তু আন্তঃনাক্ষত্রিক পারি জমানোর কাজটি আপাতত এখনই হচ্ছে না। এখানে প্রযুক্তি যতনা বড় বাঁধা, দূরত্বও তার চেয়ে কম বগ বাঁধা নয়। কারণ আমাদের নিকটতম নক্ষত্র আলফা সেন্টুরি থেকে আমাদের এই পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ৪.৩৪ বছর, কাজেই এই প্রতিবেশী নক্ষত্রে পারি জমাতে যদি কয়েক হাজার বছর লাগে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম তার সময়ের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বসমূহ বিচার বিশ্লেষণ করে ‘মহাবিশ্বের চুড়ান্ত পরিণতি’ সম্পর্কে জানিয়েছেন। বিজ্ঞানের সকল তত্ত্বের মতো এই পরিণতিও কিছু অনুমান নির্ভর এবং অনুমান সঠিক হলে পরিণতিও সঠিক হয়।
বিজ্ঞানের তথ্য মতে এই মহাবিশ্বের বয়স ১০-১৫ বিলিয়ন বছর হবে। আমাদের এই পৃথিবীর জন্ম হয়েছে ৪.৫ বিলিয়ন বছর পূর্বে। এই পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব হয়েছে মাত্র ৩ বিলিয়ন বছর পূর্বে । মানুষের আবির্ভাব আরো অনেক পরে। এইতো মাত্র সেদিন। মানুষের এখন যে অবয়ব, আকার, আকৃতি, গঠন কিছুদিন আগেও ঠিক তেমনটি ছিল না। কাজেই খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে পৃথিবীতে মানুষের আকার আকৃতি ঠিক এমনই থাকবেতো অদূর ভবিষ্যতে? নাকি এই প্রজাপ্তির বিলুপ্তি হয়ে আবির্ভাব ঘটবে ভিন্ন কোনো প্রজাতির। সেই নতুন প্রজাতি নতুন পরিবেশের সাথে নতুনভাবে খাপ খাইয়ে চলবে। হয়তো সেই প্রজাতি আরো বেশি বুদ্ধিমান হবে এখনকার মানুষের চেয়ে। আজকের মানুষেরা হারিয়ে যাবে, নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পেরে, যেমনটা হারিয়ে গেছে অতিকায় ডাইনোসারগুলো। তবে তাতে মহাবিশ্বের পরিণতির তেমন কোনো হেরফের ঘটবে না। মহাবিশ্বের চুড়ান্ত পরিণতির জন্য মানুষ কোনো বিশেষ গুরুত্বই বহন করে না। মানুষ অপরিহার্য নয় এর টিকে থাকার জন্য, কিংবা এর চুড়ান্ত পরিণতির জন্য। মানুষের জন্মেরও বহু আগে থেকেই এই মহাবিশ্ব ছিল। মানুষের বিলুপ্তির অনেক পরেও এই মহাবিশ্ব টিকে থাকবে। এই মহাবিশ্ব চলবে নিজস্ব গতিতে, নিজস্ব নিয়মে। মহাবিশ্ব এগিয়ে যাবে তার চুড়ান্ত পরিণতির দিকে।

Facebook Comments

comments