দেওয়ানবাগীর ‘মোজেজায়’ কমলাপুরে উটের খামার! (ভিডিও)

উদ্যোগ ২০০৪ সালের। ইতোমধ্যে পার হয়েছে ১৪ বছর। রাজধানীর কমলাপুর এলাকায় গড়ে ওঠে উটের খামার। দিনকে দিন এটি জনপ্রিয় হচ্ছে। তপ্ত মরুর প্রাণী উটের জীবনাচার দেখতে প্রতিদিন উৎসুক জনতা ভিড় করেন। উটগুলোর বসবাসের উপযোগী করতে প্রায় ১০ বিঘা জমিকে করা হয়েছে কৃত্রিম মরুভূমি। বর্তমানে এই খামারে ৩১টি উট রয়েছে। সারাক্ষণ সেগুলো ১০/১২ জন দেখভাল করছেন।

কিন্তু, কেন বাংলাদেশের মত নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় উটের চাষ? এ প্রশ্নের উত্তরের পেছনে রয়েছে নিগুঢ় ইতিহাস। মূলত উটের খামারটি নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন দেওয়ানবাগী পীর।

ওলি-আউলিয়ারা যেভাবে যুগে যুগে তাদের নিদর্শন বা মোজেজা দেখিয়েছেন, সে ইচ্ছে থেকেই দেওয়ানবাগী অসম্ভবকে সম্ভবের নিদর্শন হিসেবে উটের খামার করেছেন।

যেমনটি পরিবর্তন ডটকমের সঙ্গে আলাপকালে খামারের তত্ত্বাবধায়ক শাহার আলীর কথাতেও পাওয়া গেল, ‘বিভিন্ন ওলি-আউলিয়া তাদের নানা কেরামতি (নিদর্শন) দেখিয়েছেন। যেমন: শাহজালাল (রহ.) তার মাজারে কবুতর পালেন, বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.) কুমির, শাহ কামাল (রহ.) তার মাজারে পুষেছেন গজার মাছ। নিজের দরবারে এমন নির্দশন স্থাপনের ইচ্ছা থেকেই দেওয়ানবাগী মরুর দেশের প্রাণী উট পালন শুরু করেন।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে উট পালন সম্ভব নয়। কিন্তু, দেওয়ানবাগী ২০০৪ সালে রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনে প্রথম উটের খামার প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকে এটিকে তার একটি অলৌকিক বিষয় বলে মনে করেন দর্শনার্থীরা। এখানে নিয়োজিত খাদেমরা বিশ্বাস করেন, দেওয়ানবাগী ওলি-আল্লাহদের মতোই মোজেজা প্রতিষ্ঠা করেছেন।’

খামারের এই তত্ত্বাবধায়কের ভাষ্যে, গুগুল সার্চ দিলেও বাংলাদেশে উটের একমাত্র খামারটি প্রদর্শিত হয়, যা দেওয়ানবাগী হুজুর প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচারিত হয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন শুধুমাত্র মরুর দেশে নয়, বাংলাদেশেও উট পালন করা সম্ভব।

উটের খামার বিষয়ে পরিবর্তন ডটকমের পক্ষ থেকে দেওয়ানবাগী পীরের কাছে প্রশ্ন পাঠানো হয়। প্রশ্নপত্র পৌঁছে দেন তার মিডিয়া প্রধান ড. মেহেদী।

উত্তরে উটের খামার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে দেওয়ানবাগী পীর পরিবর্তন ডটকমকে বলেছেন, ‘কূল-কায়নাতের রহমত হযরত রাসূল (সা.)- এর স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য আমি উটের খামার করেছি। কোনো ব্যবসা করার জন্য নয়। উটের পৃষ্ঠে আরোহন করেই আমাদের দয়াল রাসূল হযরত মোহাম্মদ (সা.) হিজরত করেছেন, শত্রুদের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের মোকাবিলা করেছেন।’

উটের খামার সরেজমিনে দেখা যায়, উট গরুর মতোই খাবার খায়। উত্তেজিত হলে কোনো কোনো পুরুষ উট কাছাকাছি থাকা মানুষকেও কামড়ে দেয়।

দেওয়ানবাগীর এই খামারে বর্তমানে ৩১টি উট রয়েছে। পুরুষ ১১টি, বাকিগুলো মাদি। বর্তমানে বাচ্চা প্রসবের উপযোগী হয়েছে ১২/১৪টি মাদি উট। একটি মাদি উট বছরে ৩/৪টি বাচ্চা প্রসব করে। বাচ্চা প্রসবের পর প্রতি উট থেকে গড়ে ৬/৮ লিটার পর্যন্ত দুধ পাওয়া যায়।

বর্তমানে খামারের উটগুলোর মধ্যে রাজস্থান থেকে আনা হয়েছে ৯টি। বাকিগুলো বাংলাদেশেই জন্ম নিয়ে বড় হয়েছে। অবশ্য এখন পর্যন্ত সরাসরি দেশের বাইরে থেকে আনা উটের মধ্যে ৫/৬টি মারা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রজনন ক্ষমতা সম্পন্ন মাদি উটকে ফার্মের পুরুষ উট দিয়েই প্রজননের ব্যবস্থা করা হয়। এজন্য তাদের স্থানীয় কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও নিতে হয় না। ২০০৪ সাল থেকেই এই ব্যবস্থায় মাদি উটের বাচ্চা প্রসব হচ্ছে।

একটি উট জবাই করে ৮/৯ মন মাংস পাওয়া যায়। এগুলো দিনের প্রায় অধিকাংশ সময় একটি ছাউনির মধ্যে রাখা হয়। উট মরুর দেশে তপ্ত বালুর মধ্যে বসবাস করে। উটের পায়ের নিচের অংশ নরম। ফলে তারা বালু মাটি পছন্দ করে। এজন্য খামারের বালি শক্ত হয়ে গেলে তা আবারও আচঁড়া দিয়ে নরম করা হয়।

খামারে উটকে খড়, পানি, গমের ভুষি ও কাঁচা ঘাষ খাওয়ানো হয়। সেখানে কিছু উট বেঁধে রাখা হয়েছে। আবার কিছু উট ছেড়ে দেয়া।

উট পালনে শুরুর দিকে কেমন প্রতিবন্ধকতা ছিল- জানতে চাইলে খামারের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক শাহার আলী বলেন, ‘তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা পাই না। তবে বর্ষাকালে কিছু সমস্যা হয়। প্রচুর বৃষ্টি হলে উটের বসবাসের জায়গা শুকনা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ওই সময় ট্রাকে করে বালু এনে দিতে হয়।’

খামারে ১০ থেকে ১২ জন লোক সব সময় উটগুলোর পরিচর্যায় নিয়োজিত আছেন। এ পর্যন্ত ফার্মে উটের চর্ম, জ্বর, পাতলা পায়খানা ও বমির মতো কিছু রোগ-বালই দেখা গেছে। বছরে দু’বার কৃমির ঔষুধ খাওয়ানো হয়। উটগুলোকে সুস্থ করতে বড় কোনো চিকিৎসার দরকার হয় না।

১০ বিঘার বেশি জায়গার ওপর নির্মিত খামারটি পরিচালনায় প্রতিমাসে ২ লক্ষাধিক টাকা খরচ হয়। এ খরচের জোগান দেওয়ানবাগী নিজেই দেন।

এর আগে দেওয়াবাগীর বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কোরবানীর জন্য খামারের কিছু উট জবাই করা হয়েছে। আর গেল ১২ বছরে খামার থেকে ৩২টি উট বিক্রি করা হয়েছে। প্রতিটি উট বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকায়।

দেওয়ানবাগীর মেয়ে জামাই এমএম ছাইদুর রহমান আল মাহবুবে ও ছোট ছেলে ড. মুনজুরে খোদা খামারটির সার্বিকভাবে দেখভাল করেন। তারা আরামবাগে দেওয়ানবাগীর বাবে রহমতে ধর্ম প্রচারের কাজে নিয়োজিতও আছেন।

এই খামারে উট ছাড়াও ৩টি হরিণ, ১৮টি দুম্বা, ৭টি মেষ ও ৪টি নেপালি ষাঁড় রয়েছে। এখান থেকে উটের মাংস ও দুধ বিক্রি করা হয়। প্রতিকেজি দুধ ৪৫০ টাকা, মাংস আড়াই হাজার টাকা।

দেওয়ানবাগীর ছোট ছেলে ড. মুনজুরে খোদা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘২০০৪ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মুষলধারে বৃষ্টি হয়। এতে ঢাকা শহর পানিতে ডুবে যায়। বাবে মদীনা, দেওয়ানবাগ শরীফের উটের খামারের ভেতর হাঁটু পর্যন্ত পানি জমে। উটগুলো পানির মধ্যেই দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু, কি আশ্চর্য! একহাঁটু পানির মধ্যেই বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ওই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর উট শাবকের জন্ম হয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, শাবকটি জন্ম নিয়ে হাঁটু পানিতে ডুবে যায়। কিন্তু, তার মৃত্যু হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘মহান রাব্বুল আলামীনের অপার দয়ায় শাবকটির জন্মের ঘটনার মাধ্যমে পশু চিকিৎসকদের কথা ভুল প্রমাণিত হয়। অতঃপর মহান মুর্শেদ দয়া করে এ উট শাবকের নাম রাখেন- বিপ্লব। এ বিরল ঘটনার মাত্র এক মাস ৫ দিন পর ২১ অক্টোবর খামারে দ্বিতীয় উট শাবকের জন্ম হয়। মহান মুর্শেদ এ উট শাবকের নাম রাখেন- দুর্লভ। এভাবে একের পর এক উট শাবকের জন্মের ঘটনা ঘটতেই আছে।’

সূত্র: পরিবর্তন

Facebook Comments

comments