আন্দালুসিয়া বিজয় ও মহান সেনানায়ক তারিক বিন যিয়াদ

মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ

বিজয়ী ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অন্যতম সেনানায়ক তারিক বিন যিয়াদ। বিশ্বজয়ী সেনাপতিদের মাঝে স্পেন বিজয়ী এই সেনাপতি স্বতন্ত্র একজন। তার বিজয় অভিযানের মধ্য দিয়ে ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিমের আইবেরীয় উপদ্বীপে জন্ম হয় মধ্যযুগের মুসলিম সভ্যতার লীলাভূমি ‘আন্দালুসিয়া’র। সুদীর্ঘ আট শতাব্দীব্যাপী এই রাষ্ট্র অন্ধকার ইউরোপ ও বাকী বিশ্বকে সভ্যতার আলোয় আলোকিত করে রেখেছিল। জাতিগতভাবে বার্বার তারিকের জন্ম উত্তর আফ্রিকার মরক্কোতে। তার দাদা আবদুল্লাহই ছিলেন তাদের পরিবারের প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তি।

তারিক বিন যিয়াদের শৈশব ছিল অন্য সকল মুসলিম শিশুর মতোই। কুরআন-হাদীসের জ্ঞান অর্জনের মধ্য দিয়েই তার শিক্ষা জীবনের সূচনা হয়। ইসলামী খিলাফতের জিহাদ, বিজয় ও প্রতিরক্ষার মতো বীরোচিত মহাপুণ্যময় কাজের প্রতি প্রবল আকর্ষণ থেকে অল্প বয়সেই তিনি সেনাদলে যোগদান করেন। উমাইয়া শাসনের অধীন মরক্কোর গর্ভনর ও সেনানায়ক মুসা বিন নুসাইরের অধীনে বহু যুদ্ধে তিনি তার সাহস ও যোগ্যতার পরিচয় দান করেন। মুগ্ধ হয়ে মুসা বিন নুসাইর তাকে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী শহর তাঞ্জিয়ারের শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ দান করেন।

তৎকালীন স্পেনের শাসক ভিজিগথিক রাজা রডারিক ছিলেন একজন চরিত্রহীন অত্যাচারী শাসক। স্পেনের জনগণ থেকে শুরু করে তার নিজের লোকেরাও তাকে পছন্দ করতো না। তারা সুযোগ খুঁজছিল তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার। এর মধ্যে তাঞ্জিয়ারের নিকটবর্তী সিউটার শাসনকর্তা কাউন্ট জুলিয়ানের মেয়েকে দুশ্চরিত্র রাজা রডারিক কর্তৃক লাঞ্চিতের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কাউন্ট জুলিয়ান রাজা রডারিককে ক্ষমতাচ্যুত করতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠেন। তিনি ও আরও সমর্থকেরা এই অনাচার ও অত্যাচারের শেষ দেখতে উত্তর আফ্রিকার মুসলিম শাসকদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। এ ছাড়া স্পেনবাসী পূর্ব থেকেই মুসলমানদের ন্যায়নিষ্ঠ ইনসাফপূর্ণ শাসনের কথা জানতো। ফলে তারা মুসলমানদেরকে স্পেনে আসার আমন্ত্রণ জানায়।

তারিক বিন যিয়াদ স্পেনবাসীর সাহায্যের আবেদন গ্রহণ করেন এবং মুসা বিন নুসাইরের কাছে স্পেনে অভিযান পরিচালনার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করেন। মুসা তারিককে অপেক্ষা করতে বলে দামেশকের খলীফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের কাছে স্পেনে অভিযানের অনুমতির আবেদন করেন। খলীফা তাকে অভিযানের অনুমতি প্রদান করেন।

খলীফার অনুমতির প্রেক্ষিতে মুসা বিন নুসাইর তারিক বিন যিয়াদকে অভিযানের জন্য প্রস্তুতির নির্দেশ দেন। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তারিক বার্বার সেনাপতি তারিফ ইবনে মালিকের নেতৃত্বে স্পেনে ছোট একটি গোয়েন্দা দল প্রেরণ করেন। এই দলটি ৭১০ ঈসায়ীর জুলাই, ৯১ হিজরীর রমজান মাসে কাউন্ট জুলিয়ানের সাহায্যে স্পেনে অবতরণ করে। তারা স্পেনকে পর্যবেক্ষণ করে স্পেন আক্রমণ করার ব্যাপারে অনুকূল পরিস্থিতি থাকার বার্তা প্রেরণ করেন। তারিফ ইবনে মালিকের নামানুসারে স্পেনে তাদের অবতরণস্থল তারিফা নামে পরিচিত হয়।

তারিফের ইতিবাচক বার্তায় উৎসাহিত হয়ে তারিক বিন যিয়াদ স্পেনে অভিযান পরিচালনা করেন। ৭১১ ঈসায়ীর ২৭ শে এপ্রিল, ৯২ হিজরীর ৫ই রজব তিনি সাত হাজার সৈনিকের একটি বাহিনী নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে স্পেনে অবতরণ করেন। তার নামানুসারে তার অবতরণস্থল পরবর্তীতে ‘জাবালুত তারিক’ (তারিকের পাহাড়) নামে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে এটি ‘জিব্রালটা’ নামে পরিচিত।

জাবালুত তারিকে কিছুদিন অবস্থান করে তারিক এখানে তাদের জন্য একটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেন। পরবর্তীতে তিনি কাউন্ট জুলিয়ানের নির্দেশনা অনুযায়ী স্পেনের অভ্যন্তরপানে প্রবেশ করেন। তারিক ইবনে যিয়াদ যখন অগ্রসর হচ্ছেন, রাজা রডারিক তখন স্পেনের উত্তরে কিছু বিদ্রোহী উপজাতির সাথে সংঘাতে লিপ্ত ছিলেন। তারিকের অগ্রসর হওয়ার কথা জানতে পেরে তিনি তাৎক্ষণিক যুদ্ধ বন্ধ করে তারিককে প্রতিরোধ করতে দক্ষিণ দিকে আসেন।

তারিক বিন যিয়াদ স্পেনের তৎকালীন রাজধানী টলেডোর দিকে এগিয়ে যান। তাকে বাধা দিতে রাজা রডারিক এক লাখ সৈনিকের সমাবেশ ঘটান। সৈন্য বাহিনীর এই বিশাল সংখ্যার কথা জানতে পেরে তারিক মুসার বিন নুসাইরের কাছে সাহায্য চেয়ে পাঠান। তিনি তাকে আরো পাঁচ হাজার সৈন্য প্রেরণ করেন। এর মাধ্যমে মুসলিম বাহিনীর মোট সৈন্য সংখ্যা দাঁড়ায় বারো হাজার।

উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয় গোয়াদিলেত নদীর তীরে বর্তমান মদীনা সিদনিয়া শহরের কাছে। ৭১১ ঈসায়ীর ১৮ই জুলাই, ৯২ হিজরীর ২৮শে রমজান উভয় বাহিনীর মধ্যে তুমুল লড়াই শুরু হয়। দীর্ঘ আট দিনের লড়াইয়ে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে। রাজা রডরিক যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হয়।

গোয়াদিলেতের যুদ্ধের পর তারিক রাজধানী টলেডোর দিকে অগ্রসর হন। পথিমধ্যে তিনি কর্ডোভা, গ্রানাডা, মালাগাসহ বিভিন্ন শহর জয় করেন। রাজধানী টলেডোতে প্রবেশের পর তিনি তার উদারতা ও ন্যায়বিচার দ্বারা জনগণের মন জয় করেন। এরপর তিনি টলেডো থেকে আরো উত্তরে অগ্রসর হন এবং বাস্ক উপসাগর পর্যন্ত স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চল জয় করেন। এরপর তিনি মুসা ইবনে নুসাইরকে স্পেনে আগমনের জন্য আমন্ত্রণ এবং তাকে সাহায্য করার জন্য আবেদন জানান।

মুসা ৭১২ ঈসায়ীর জুন, ৯৩ হিজরীর রমজানে স্পেনে আগমন করেন। তিনি তারিকের অবিজিত স্থানসমূহ বিজয় করার মধ্য দিয়ে রাজধানী টলেডোর দিকে অগ্রসর হন। টলেডোতে উভয় সেনাপতির মধ্যে সাক্ষাৎ ঘটে। টলেডোতে কিছুদিন অপেক্ষার পর তারা স্পেনের বাকি অংশ জয়ে বেরিয়ে পড়েন।

তারা স্পেনের বাকি অংশ বিজয়ের জন্য যুদ্ধরত ছিলেন- এমন সময় খলীফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক তাদেরকে স্পেনের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানোর জন্য রাজধানী দামেশকে ডেকে পাঠান। উভয় সেনাপতি স্পেনে তাদের কাজ গুছিয়ে রেখে দামেশকের দিকে যাত্রা করেন। তারা দামেশকে পৌঁছার আগেই খলীফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক ইন্তেকাল করেন এবং পরবর্তী খলীফা হিসেবে তার ভাই সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। দামেশকে পৌঁছে তারা নতুন খলীফাকে স্পেনের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন। খলীফা সুলাইমান তাদেরকে দামেশকে অবস্থানের আদেশ প্রদান করেন। পরবর্তী বাকি জীবন তারা দামেশকেই অতিবাহিত করেন।

৭২০ খ্রিস্টাব্দে দামেশকে আন্দালুসিয়া বিজয়ী মহান সেনাপতি তারিক ইবনে যিয়াদ ইন্তেকাল করেন। ইউরোপের বুকে প্রথম মুসলিম বিজয়াভিযান পরিচালনাকারী এই সেনাপতি আজও কোটি মুমিনের প্রেরণা হয়ে অমর হয়ে আছেন। স্পেন জয় করে আন্দালুসিয়া প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন ইউরোপে মুসলিম সভ্যতার সূচনা করেন। রেনেসাঁ পরবর্তী ইউরোপীয় সভ্যতার জ্ঞানগত ভিত মূলত আন্দালুসিয়ার মুসলিম সভ্যতার মাঝেই প্রোথিত রয়েছে। সুতরাং তারিক বিন যিয়াদের স্পেন জয়ের মধ্য দিয়েই ইউরোপের রেনেসাঁর প্রকৃত সূচনা হয়।

সূত্র: পরিবর্তন

Facebook Comments

comments