স্টিফেন হকিং বনাম একজন জামাল নজরুল ইসলাম

জি. মুনীর

একটি জাতিকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে গুণীজনদের যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়া অপরিহার্য। জীবদ্দশায় মেধাবীদের উপযুক্ত স্থানে নিয়োজিত করে তাদের কর্মসাধনার সহজ সুযোগ করে দেয়া দরকার, যাতে তারা তাদের মেধা-মনন কাজে লাগিয়ে জাতির জন্য অনন্য অবদান রেখে জীবনের ইতি টানতে পারেন। জাতির জন্য বয়ে আনতে পারেন গৌরব। আমাদের অনেকেই তাদের কর্র্মসাধনার মাধ্যমে জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তাদের ইন্তেকালের পর যথাযোগ্য শ্রদ্ধার সাথে স্মরণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাদের অবদান তুলে ধরার পাশাপাশি তাদেরকে প্রেরণার উৎস হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্র তৈরি করার দায়িত্ব আমাদের রয়েছে। এ কথা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় দারিদ্র্য চরমে। কারণ, জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আন্তর্জাতিক খ্যাতি বয়ে এনেছেন এমন অনেক অনন্য ব্যক্তিত্বকে আমরা দেখি নির্মম নীরবতায় এই নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে। তা ছাড়া মৃত্যুর পর তাদের স্মরণে আমাদের কার্পণ্য সীমাহীন ও ক্ষমাহীন মাত্রার। ফলে এরা অল্প সময়ের মধ্যেই হারিয়ে যান বিস্মৃতির অতলগহ্বরে। এর কারণ, আমরা জাতীয়ভাবে দুঃসহ ব্যক্তিপূজার অপসংস্কৃতিতে ডুবে আছি। ফলে প্রকৃত গুণীজনদের স্মরণের সময় আমাদের হাতে নেই। এই চরম ব্যক্তিপূজা আমাদের চরম অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা কতজনকেই তো কতভাবে ব্যক্তিপূজার আদলে স্মরণ করি কিন্তু আমরা কি স্মরণ করি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান আমাদের বিজ্ঞানীদের?

সম্প্রতি বাংলাদেশের দু’জন অনন্যসাধারণ বিজ্ঞানীর প্রসঙ্গ সামনে রেখে এসব কথা বলা। গত ৫ মার্চ ২০১৮ অনেকটা নীরবেই আমাদের মাঝ থেকে চলে গেলেন ‘ওরাল রিহাইড্রেশন স্যালাইনের’ উদ্ভাবক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ড. রফিকুল ইসলাম। সাধারণত এটি ওরস্যালাইন বা মুখে খাওয়ার স্যালাইন নামেই সাধারণ্যে সুপরিচিত। কেউ কেউ এ স্যালাইনকে ‘ঢাকা স্যালাইন’ নামেও অভিহিত করেন। এ স্যালাইন ডিহাইড্রেশনের কারণে সৃষ্ট ডায়রিয়ার জন্য একটি সরল সমাধান, বিশেষ করে শিশুদের ডায়রিয়ার জন্য খুবই কার্যকর এক প্রতিকার। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ভারতে বাংলাদেশী শরণার্থী-শিবিরে ডায়রিয়া দেখা দেয় মহামারি আকারে। তখন এ রোগের ওষুধ যা ছিল, তা তরলাকারে রগ দিয়ে ঢুকানো হতো। সে সময় এই ওষুধের বড় ধরনের অভাব দেখা দেয়। এর বিকল্প হিসেবে ড. রফিকের উদ্ভাবিত ওরস্যালাইন শরণার্থীদের জীবনে প্রাণদায়ী ওষুধ হিসেবে আবির্ভূত হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী নিশ্চিত মৃত্যু থেকে রক্ষা পায়। এক সময় বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই স্যালাইনের অনুমোদন দেয়। ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’ এ স্যালাইন উদ্ভাবনকে অভিহিত করে ‘দ্য মোস্ট ইম্পোরট্যান্ট মেডিক্যাল অ্যাডভান্স অব দ্য টোয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’ হিসেবে।

এ স্যালাইন এখন বাংলাদেশের প্রতিটি ওষুধের দোকানে, এমনকি মুদিদোকানেও ডায়রিয়ার মহৌষধ হিসেবে ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়। তা ছাড়া কেউ চাইলে এ স্যালাইন খুব সহজেই ঘরে তৈরি করে নিতে পারেন। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে মা-বোনেরা এ স্যালাইন তৈরির নিয়ম জানেন। এক মুঠো চিনি বা গুড় ও তিন চিমটি লবণ আধা লিটার পানিতে মেশালেই এই স্যালাইন তৈরি হয়ে যায়। বিশ্বজুড়ে এ স্যালাইন খুবই জনপ্রিয়।

এ স্যালাইনের উদ্ভাবক আইসিডিডিআর,বি’র সাবেক প্রধান চিকিৎসক ড. রফিকুল ইসলাম ছিলেন একজন প্রচারবিমুখ মানুষ, কিন্তু তিনি গবেষণায় ছিলেন অন্তঃপ্রাণ। জন্ম ১৯৩৬ সালে, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে নেন এমবিবিএস ডিগ্রি। মধ্য-ষাটের দশকে যোগ দেন আইসিডিডিআর,বি-তে। অবসর নেন ২০০০ সালে। লন্ডনে উচ্চশিক্ষা নেন ট্রপিক্যাল মেডিসিন ও হাইজিন বিষয়ে।

আন্তর্র্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এ বিজ্ঞানী ৮২ বছর বয়সে গত ৫ মার্চে ঢাকায় এ্যাপোলো হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। অনেকটা নীরবে তার এই চলে যাওয়া সত্যিই দুঃখজনক ও পরিতাপের বিষয়। ব্যক্তিপূজায় ডুবে থাকা বাংলাদেশে হয়তো এটাই স্বাভাবিক; অথচ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন বাংলাদেশী বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি আমাদের গর্বের ধন।

আরেকজন সমধিক গর্বের ধন বলে বিবেচিত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম অনেকটা একই ধরনের নীরবতায় মাত্র পাঁচ বছর আগে ইন্তেকাল করেন। কিন্তু এ পাঁচ বছরের মধ্যেই তিনি যেন চলে গেছেন স্মৃতির আড়ালে। তাকে অন্তত জন্মদিন বা মৃত্যুদিনে স্মরণ করার বিষয়টি যেন আমরা জাতীয়ভাবে নিষিদ্ধ তালিকায় স্থান করে দিয়েছি। অথচ তিনি তার কর্মসাধনার মধ্য দিয়ে জাতীয়ভাবে আমাদের অনেক উচ্চাসনে তুলে এনেছেন।

এক সময় সত্তরের দশকে একটি জাতীয় বিজ্ঞান সাপ্তাহিক সম্পাদনার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট থাকার সময় বাংলাদেশের বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে খবরাখবর রাখতে হতো আমাকে। সে সময় বিশেষ করে কোনো বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর কোনো সাফল্যের কথা জানতে পারলে, সেটি প্রচারেও ছিল আমার প্রবল আগ্রহ। সে সময় প্রফেসর জামাল নজরুল যতটুকু জানতে পেরেছি, তাতেই তাকে স্থায়ী ঠাঁই দিয়েছি অনন্য শ্রদ্ধার আসনে। তখন থেকেই তাকে বিবেচনা করে আসছি জাতীয় গর্বের ধন হিসেবে। সময় ও সুযোগ পেলেই পত্রিকায় তাকে নিয়ে দু’কলম লিখেছি। কিন্তু বিগত শতকের আশির দশক থেকে জাতীয় দৈনিকের সাথে সার্বক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট হওয়ার ফলে বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখির চর্চার সুযোগ অনেকটা সীমিত হয়ে পড়ে। তা ছাড়া, নতুন করে তথ্যপ্রযুক্তি যুগের আবির্ভাবের পর দুই দশক ধরে একটি তথ্যপ্রযুক্তি মাসিকের সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করছি। সে কারণেও বিশুদ্ধ বিজ্ঞান বিষয়ে আমার লেখার হার কমেছে। তবে বিষয়টি আমাকে মাঝে মধ্যে পীড়া দেয়। কারণ, আমি মনে করি বিশুদ্ধ বিজ্ঞানচর্চাই প্রকৃত বিজ্ঞানচর্চা। আর প্রযুক্তি হচ্ছে বিজ্ঞানের বাণিজ্যিক শাখা, কোনোমতেই মৌলবিজ্ঞানের সমান্তরাল অবস্থান এর নেই। এই বিশ্বাস থেকেই যারা বিশুদ্ধ বিজ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা রয়েছে সমধিক। সেই সূত্রেই অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের প্রতি অবহেলা আমার মনঃপীড়ার কারণ।

গত ১৬ মার্চ ২০১৮ ছিল প্রফেসর নজরুল ইসলামের পঞ্চম মৃত্যুদিন। এর ক’দিন আগেই ভেবেছিলাম, তার এবারের মৃত্যুদিনে তাকে স্মরণ করে একটি লেখা লিখব। এরই মধ্যে এর মাত্র দু’দিন আগে গত ১৪ মার্চ ২০১৮ আমরা হারালাম এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ফিজিসিস্ট-কসমোলজিস্ট স্টিফেন উইলিয়াম হকিংকে। ফলে গত সপ্তাহের লেখাটি সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে আমাকে লিখতে হলো বিজ্ঞানী হকিংকে নিয়ে। আর বক্ষ্যমাণ এ লেখার মাধ্যমে প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলামকে স্মরণ করতে হলো এক সপ্তাহ পিছিয়ে। হকিং ছিলেন একজন ফিজিসিস্ট ও কসমোলজিস্ট। অপর দিকে জামাল নজরুল ইসলাম ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন বাংলাদেশী ম্যাথমেটিক্যাল ফিজিসিস্ট-কসমোলজিস্ট। অনেকের মতে, বিজ্ঞানে প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলামের অবদান হকিংয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। তবে পাশ্চাত্য গণমাধ্যম, সেই সাথে বিশ্বের অন্যান্য স্থানে হকিংয়ের অবদান প্রচারে যতটা সক্রিয় ছিল, জামাল নজরুল ইসলামকে নিয়ে তা মোটেও ছিল না। ফলে তার সম্পর্কে তেমন জানতে পারেনি বিশ্বের মানুষ, এমনকি আমরা নিজেরাও। তা ছাড়া তিনি নিজেও ছিলেন একজন প্রচারবিমুখ মানুষ।

তার জন্ম ঝিনাইদহে ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। ইন্তেকাল ২০১৩ সালের ১৬ মার্চ, চট্টগ্রামে। পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল ও কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজ ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি সিনিয়র ক্যামব্রিজ ও হায়ার সিনিয়র ক্যামব্রিজ পরীক্ষা পাস করেন পাকিস্তানের মারিতে অবস্থিত লরেন্স কলেজ থেকে। ফাঙ্কশনাল ম্যাথমেটিকস ও থিওরিটিক্যাল ফিজিক্সে বিএসসি অনার্স ডিগ্রি নেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে। একই বিষয়ে অনার্স ডিগ্রি নেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৬০ সালে নেন মাস্টার্স ডিগ্রি। ১৯৬৪ সালে অ্যাপ্লাইড ম্যাথমেটিকস ও থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স বিষয়ে পিএইচডি করেন ক্যামব্রিজ থেকে। ডিএসসি ডিগ্রি নেন একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে।

তিনি অধ্যাপনা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য। চট্টগাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রিসার্চ সেন্টার ফর ম্যাথমেটিক্যাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্সেস’-এর পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘ দিন। তিনি এর প্রতিষ্ঠাতাও। ১৯৬৩-৬৫ সময়ে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো ছিলেন ম্যারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্স ও অ্যাস্ট্রোনমি ডিপার্টমেন্টে। ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময়ে তিনি স্টাফ মেম্বার হিসেবে কাজ করেছেন ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমিতে, যা পরবর্তী সময়ে ক্যামব্রিজের ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমির সাথে একীভূত করা হয়। ১৯৭১-৭২ সময়ে এর পর গবেষক হিসেবে কাজ করেন ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে। ১৯৭২-৭৩ সময়ে ছিলেন ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোনমি ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট। ১৯৭৩-৭৪ সময়ে কাজ করেন লন্ডনের কিংস কলেজের ফ্যাকাল্টি অব অ্যাপ্লাইড ম্যাথমেটিকসের লেকচারার হিসেবে। ১৯৭৫-৭৮ সময়ে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ, কার্ডিফের সায়েন্স রিসার্চ কাউন্সিল ফেলো। ১৯৭৮ সালে যোগ দেন লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টিতে গণিত বিভাগের লেকচারার ও রিডার হিসেবে। সেখান থেকে ফিরে এসে ১৯৭৮-১৯৮৪ সময়ে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক। ২০০৬ সালে তাকে করা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এমেরিটাস।

তিনি একক কিংবা যৌথভাবে লিখেছেন অথবা সম্পাদনা করেছেন ৫০টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ। বিভিন্ন বিজ্ঞান জার্নালে লিখেছেন জনপ্রিয় বিজ্ঞানবিষয়ক লেখা। লিখেছেন ৯টি বই। বাংলায়ও লিখেছেন কয়েকটি বই। বিশেষত ব্ল্যাকহোলের ওপর তার লেখা বাংলা বই প্রকাশিত হয়েছে বাংলা একাডেমি থেকে। তার অনেক গবেষণা প্রবন্ধ ও বই বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। তার লেখা বই ‘দ্য আল্টিমেট ফেইট অব দ্য ইউনিভার্স’ অনেক সুখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহার হয়।
তার লেখা কয়েকটি বইয়ের মধ্যে আছে : The Ultimate Fate of the Universe. Cambridge University Press, Cambridge, England; Rotating Fields in General Relativity, Cambridge University Press, Cambridge, England; An Introduction to Mathematical Cosmology, Cambridge University Press, Cambridge, England. এ ছাড়া, তিনি আরো কয়েকজনের সাথে মিলে যৌথভাবে কয়েকটি বই লিখে গেছেন।

তিনি যোগ দিয়েছেন অনেক আন্তর্জাতিক সম্মেলন, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ ও নানা বৈঠকে- বাংলাদশে ও দেশের বইরে। ১৯৯৭ সালে তিনি আমন্ত্রিত হন এস চন্দ্র শেখরের স্মরণে আয়োজিত ‘ম্যাথমেটিক্যাল ফিজিক্স’-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়ামে। এতে একটি বিশেষ অধিবেশন আয়োজিত হয়েছিল পাকিস্তানের নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী আবদুস সালামের ওপর। কলকাতায় অনুষ্ঠিত এ সিম্পোজিয়ামের আয়োজক ছিল ক্যালকাটা ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটি।
তিনি ফেলো ছিলেন ট্রিয়েস্টের ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স, ক্যামব্রিজ ফিলোসফিক্যাল সোসাইটি, রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি ও বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের। তিনি নির্বাচিত ফেলো ছিলেন ইসলামিক ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের।

তিনি ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স থেকে সিনিয়র গ্রুপে পান স্বর্ণপদক, ১৯৯৮ সালে পান অ্যাকাডেমি ন্যাজিওন্যালি, ডেলি সায়েন্জ থেকে পান মেডেল লেকচার অ্যাওয়ার্ড, একই বছরে পান বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ফর সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি; ২০০১ সালে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে পান একুশে পদক; ২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পান পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে রাজ্জাক-সামসুন লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।

তার গবেষণার ক্ষেত্র ছিল : থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স, অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স, ম্যাথমেটিক্যাল ফিজিক্স, কসমোলজি, জেনারেল রিলেটিভিটি ও কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি। মোটামুটি স্টিফেন হকিংয়ের গবেষণার ক্ষেত্রও ছিল এসব বিষয়নির্ভর। তিনি কাজ করেছেন বিখ্যাত বিজ্ঞান লেখক ও জ্যোতির্পদার্থবিদ ফ্রেড হোয়েলের সাথে। সারা জীবন জোতির্পদার্থবিদ্যার প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। অভিযোগ আছে, তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজনীতির শিকার হয়েছিলেন। নয়তো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলামকে আমরা হয়তো দেখতে পেতাম আরো অনেক বেশি উচ্চতায়। এই রাজনীতির শিকার হয়েই তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন এবং যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।

তিনি গবেষণার সময় বড় বড় ক্যালকুলেশন করতেন হাতে লিখে। সাধারণত তিনি ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতেন না। সৃষ্টিকর্তা অনেক মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তার বিশেষ গুণের অধিকারী করে। সাধারণ মানুষের পক্ষে তাদের মূল্যাবধারণ সহজ হয় না। হয়তো প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম তেমনি বিরল ব্যক্তিদেরই একজন। যিনি অনন্যসাধারণ মেধা ও মানবিক গুণাবলি ধারণ করতেন। তার লেখা বই ‘আল্টিমেট ফেইট অব দ্য ইউনিভার্স’ বিশ্ববিজ্ঞানী সমাজে তাকে স্টিফেন হকিং ও স্টিফেন ওয়েনবার্গের কাতারে নিয়ে দাঁড় করায়। এ বইটি মহাবিশ্বের সুদূরভবিষ্যৎ সম্পর্কিত একটি অথোরিটেটিভ বুক হিসেবে বিবেচিত। এ বইটির মাধ্যমে তিনি বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারায় অপরিমেয় অবদান রেখেছেন। অধ্যাপক ফ্রিম্যান ডাইসন তার ‘ফিজিক্স অব ইমমরটালিটি’-তে স্বীকার করেন : প্রথম যে ব্যক্তি সুদূর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করেছেন, তিনি হচ্ছেন প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম। একই সাথে তিনি এ-ও স্বীকার করেন, জামাল নজরুল ইসলামের ‘দ্য আল্টিমেট ফেইট অব দ্য ইউনিভার্স’ তার গবেষণাকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। ‘রটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি’র ওপর গবেষণার কারণে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডিএসসি ডিগ্রি দিয়ে সম্মানিত করে। সবিশেষ উল্লেখ প্রয়োজন, মহাবিশ্বের সুদূরভবিষ্যৎ সম্পর্কিত যে বইটি বিশ্বনন্দিত, সেটি জামাল নজরুল ইসলামের লেখা বই ‘দ্য আল্টিমেট ফেইট অব দ্য ইউনিভার্স’। তা ছাড়া, তার লেখা আরেকটি বই ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি’ অনেক সুপরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে স্থান করে নিতে পেরেছে। অনেক আন্তর্জাতিক জার্নালে তার গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম অনেক খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ও ব্যক্তিত্বকে পেয়েছেন তার বন্ধু হিসেবে। তাদের মধ্যে আছেন : স্টিফেন হকিং, প্রফেসর ফ্রিম্যান ডাইসন, ফাইনম্যান রিচার্ড, অমীয় কুমার বগচি, সুব্রানিয়াম চন্দ্রশেখর, আবদুস সালাম, অমর্ত্য সেন, জিম মার্লিসসহ আরো অনেকে। বিজ্ঞানী হিসেবে তার আসন ছিল সু-উচ্চে। তার অসমান্তরাল জ্ঞানসাধনাই তাকে এতটা ওপরে তুলে এনে দাঁড় করায় বিশ্বের বড় বিজ্ঞানীদের কাতারে। নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী আবদুস সালাম তার এক বক্তব্যে বলেছিলেন, এশিয়া থেকে তার পরবর্তী নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা কেবল জামাল নজরুল ইসলামই ধারণ করেন। ‘নিউ সায়েন্টিস্টস’ পত্রিকার দাবি : জামাল নজরুর ইসলাম তার ‘দ্য আল্টিমেট ফেইট অব দ্য ইউনিভার্সএ বর্ণনা করেছেন কসমিক ক্রিস্টাল বল সম্পর্কিত আধুনিক কসমোলজিস্টের ধারণাÑ সরাসরি, ব্যাপকভাবে, সংক্ষেপে ও সুস্পষ্টভাবে। এ বইটি ক্যামব্রিজ, প্রিন্সটন ও আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অবশ্যপাঠ্য। ক্যামব্রিজেই তার কর্মজীবন শুরু করার কথা; কিন্তু রাজনীতির শিকার হয়ে তাকে কর্মজীবন শুরু করতে হয় লন্ডনের কিংস কলেজে, গণিতের লেকচারার হিসেবে।

স্টিফেন হকিং তার গবেষণার বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন জামাল নজরুল ইসলামের সাথে। তাদের সম্পর্ক ব্যক্তিগত থেকে পারিবারিক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। জামাল নজরুল ইসলাম সম্পর্কে হকিং বলেছেন, ‘জেএন ইসলাম আমার রুমমেট, বন্ধু এবং আমরা ছিলাম পরস্পর পরস্পরের শিক্ষক।’ যদি বলি, জামাল নজরুল ইসলাম হকিংয়ের চেয়ে বিজ্ঞান সাধনায় কোনো অংশেই কম ছিলেন না- তবে বিন্দুমাত্র ভুল বলা হবে না।

জামাল নজরুল ইসলামের অবদান তুলে ধরতে গেলে প্রয়োজন হবে সুবৃহৎ গ্রন্থ রচনার। কিন্তু এই প্রতিভাধর বিজ্ঞানীর কর্মসাধনা ও অবদান তুলে ধরায় জাতীয়পর্যায়ে নেই আমাদের কোনো উদ্যোগ। জামাল নজরুল ইসলাম ও ড. রফিকুল ইসলামের মতো এমন অনেক গুণীজন নীরবে চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে। তাদের কথা কে মনে রাখে। এটাই আমাদের জাতীয় দৈন্য। এর প্রধান কারণ আমরা সবাই আজ ব্যক্তিপূজায় মগ্ন। ভুললে চলবে না, ব্যক্তিপূজা একটি জাতির জন্য শুধু ধ্বংসই ডেকে আনে; ভিন্ন কিছু নয়। অপর দিকে গুণীর কদর একটি জাতিকে গৌরবের আসনে দাঁড় করানোর পথ তৈরি করে- সে উপলব্ধি নিয়েই আমাদের চলা উচিত।

সূত্র: নয়াদিগন্ত

Facebook Comments

comments