সবার আগে মনোনয়ন নিল জামায়াত, প্রচারণায়ও এগিয়ে

আগামী ১৫ মে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। ইতোমধ্যেই ২ এপ্রিল থেকে গাজীপুর সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ঢাকার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা রাকিব উদ্দিন মন্ডল জেলা শহরের বঙ্গতাজ অডিটোরিয়ামে তার কর্মকর্তাদের নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে প্রায় এক ডজন প্রার্থী নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও জাতীয় অনুষ্ঠানের জনসমাগমস্থলে জনে জনে নিজেকে মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা জনসাধারণের সাথে কুশল বিনিময় করছেন। প্রতিযোগিতা চলছে যতদূর সম্ভব প্রচার প্রচারণার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা। নিজেদের প্রার্থীকে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী হিসেবে পরিচিত করতে এবং তাদের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে প্রতিটি দলই সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের মাঠে বড় দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ইসলামপন্থী তিনটি দল যথাক্রমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই পীরসাহেব) অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে। প্রচারণার দিক থেকে ইসলামপন্থী দলগুলো কিছুটা এগিয়ে রয়েছে বলে ভোটাররা মনে করছেন। এ ছাড়া মহাজোটের শরিক জাসদের পক্ষেও আর এক প্রার্থী সক্রিয় আছেন। তবে এসব প্রার্থী ও দলের পক্ষে নির্বাচনের প্রচার প্রচারণায় ইসলামপন্থী দল তিনটি এগিয়ে রয়েছে। এসব দলের মধ্যে প্রার্থী নিয়ে কোনো গ্রুপিং-লবিং আন্তঃকোন্দল নেই। ইসলামপন্থী দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামোও বেশ মজবুত।

নির্বাচনের মাঠে সাংগঠনিক ও প্রচার প্রচারণার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগামী দল হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। যেহেতু তাদের নিবন্ধন নিয়ে সমস্যায় রয়েছেন তাই গাজীপুর উন্নয়ন ফোরাম নামের ব্যানারে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তারা মেয়র পদে এবং প্রায় ১০টি ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করবে বলে জামায়াতের দলীয় সূত্র জানিয়েছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিযোগিতার জন্য দলের পক্ষ থেকে কয়েক মাস আগেই সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে গাজীপুর মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি খায়রুল হাসান জানিয়েছেন। তিনি জানান, দুই মাস আগে থেকেই আমরা গাজীপুর উন্নয়ন ফোরাম নামে একটি সংগঠনের নামে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু করি। অন্য দলগুলোর মতো আমাদের দলে কোনো আন্তঃকোন্দল নেই। আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক একজন সৎ, সাহসী, মেধাবী, কর্মঠ ও যোগ্য প্রার্থী আমাদের দলের মহানগর আমির অধ্যক্ষ সানাউল্লাকে মনোনয়ন দিয়ে দুই মাস আগেই কাজ শুরু করি। তিনি মেয়র নির্বাচিত হলে গাজীপুর মহানগরবাসীর উন্নয়নের স্বপ্ন পূরণে যথাযথভাবেই কাজ করবেন। আমাদের দলের পক্ষ থেকে সুবিধাজনক এলাকায় অন্তত ১০টি ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীও নির্বাচন করবেন। ইতোমধ্যেই গতকাল সকালে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় থেকে আমরা আমাদের মেয়র প্রার্থীর পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছি। বর্তমানে আমরা মহানগরের কাশিমপুর ও কোনাবাড়ি এলাকায় গণসংযোগ চালাচ্ছি।

অপর ইসলামী দল ইসলামী ঐক্যজোট (হেফাজতে ইসলাম ) কয়েক মাস আগেই গাজীপুর মহানগরের মেয়র এবং অন্তত ৮টি ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ শুরু করেছে। ইসলামী ঐক্যজোটের মেয়র প্রার্থী মাওলানা ফজলুর রহমান জানান, দলের পক্ষ থেকে ২০১৩ সালে মেয়র পদে নির্বাচনের জন্য আমাকে মনোনয়ন দেয়া হয়। দলে জোটগতভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হওয়ায় আমি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করি। ধর্মীয় দল হিসেবে সমাজের সৎ মানুষ হিসেবে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে। আমরা নির্বাচিত হলে জনগণের বিশ্বাসের মর্যাদা অবশ্যই রাখার চেষ্টা করব।

এ ছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের (চরমোনাই পীরসাহেব) পক্ষে থেকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের জন্য সিদ্ধান্ত আনেক আগেই নেয়া হয়েছে। এই দলের পক্ষ থেকে মেয়র পদে অধ্যক্ষ নাসির উদ্দিনকে মনোনয়ন দেয়া হয়। দলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রায় মাসখানেক আগেই ৫৭টি ওয়ার্ডের কমিটি গঠন করে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। আমাদের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির পীরসাহেব চরমোনাই মুফতি সৈয়দ মো: রেজাউল করিমের পক্ষ থেকে আমাকে মেয়র পদে নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দেয়া হয়ছে। সেই অনুযায়ী আমরা মাঠে কাজ করছি। তিনি বলেন, গাজীপুর মহানগরের বাসিন্দাদের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য বিগত সময় কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কাজ করতে পারেনি। আমাদের ইসলামী আন্দোলনের সৎ লোকের মাধ্যমে জনগণের উন্নয়ন ও অধিকার বাস্তবায়নে আমরা কাজ করব ইনশাআল্লাহ।

অন্য দিকে মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টি থেকে মেয়র পদে এখন পর্যন্ত কারো নাম শোনা না গেলেও সম্প্রতি জাসদ সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু মহানগর জাসদ নেতা রাশেদুল হাসান রানাকে দলের পক্ষ থেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেন। তিনিও প্রায় মাসখানেক যাবৎ প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ দিকে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীর নাম এখন পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়নি। তবে মনোনয়নের জন্য মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান ও সাধারণ সম্পাদক মো: জাহাঙ্গীর আলম এ দু’জনই রয়েছেন শক্ত অবস্থানে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ থেকে মেয়র পদে মনোনয়নপ্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আসাদুর রহমান কিরণ, যুগ্ম সম্পাদক শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের ছোটভাই মতিউর রহমান মতি ও মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল আহসান সরকার রাসেল। এ ক্ষেত্রে মেয়র পদে নির্বাচনে আগ্রহীদের মধ্যে আগামী ৫ ও ৬ এপ্রিল মনোনয়ন ফরম বিতরণ করবে আওয়ামী লীগ।

ফরম পূরণ করে ৭ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে তা জমা দিতে হবে। পরে ৮ এপ্রিল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মেয়র পদে চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বর্তমান যুবলীগ নেতা ও সাবেক ভাওয়াল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি রাহাত খান। তিনি বলেন, দলের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত না এলেও প্রত্যেক সম্ভাব্য প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে থেকে নিজের ও দলের পক্ষ থেকে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ ছাড়া সরকারের নানা মামলা ও নির্যাতনের শিকার বিএনপির একাধিক প্রার্থী মনোনয়নের জন্য চেষ্টা করছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক এম মান্নান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি হাসান উদ্দিন সরকারের নামই বেশি শোনা যাচ্ছে। তবে বিএনপি থেকে কে চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে আগামী ৮ এপ্রিল বলে জানিয়েছেন দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা: মাজাহারুল আলম।

তিনি জানান, আগামী ৫ও ৬ এপ্রিল ইচ্ছুক প্রার্থীরা বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করবেন। পরে হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব দিক বিবেচনায় দলীয় চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম প্রকাশ করা হবে। তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি অনেক আগে থেকেই নির্বাচনের মাঠে কাজ করে যাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ২ এপিল নির্বাচন কমিশন খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন তফসিল ঘোষণা করেছে। আগামী ১৫ মে এ দুই সিটির ভোট অনুষ্ঠিত হবে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ তারিখ ১২ এপ্রিল, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ১৫ ও ১৬ এপ্রিল, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার ২৩ এপ্রিল নির্ধারণ করা হয়েছে।

মনোনয়নপত্র উত্তোলন : গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে গতকাল বিকেল পর্যন্ত মেয়র পদে ৩ জনসহ ১৭৫ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেছেন। মেয়র পদে প্রথম মনোনয়নপত্র নিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা সানাউল্লাহ, বিএনপি পরিচয়ে সাবেক কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা শওকত হোসেন সরকার এবং ইসলামী ঐক্য জোটের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মো: ফজলুর রহমান। সংরতি নারী আসনের কাউন্সিলর পদে ৩৬ জন এবং সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদে ১৩৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেছেন।

গাজীপুর সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারের সমন্বয়কারী তারেক আহম্মেদ জানান, গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মঙ্গলবার থেকে বিভিন্ন প্রার্থীদের মধ্যে মনোনয়নপত্র বিতরণ শুরু করা হয়। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে মেয়র পদে প্রথম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মো: সানাউল্লাহ মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেছে। এর আগে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত সাধারণ ও সংরক্ষিত (মহিলা) কাউন্সিলর পদে ২৫ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র ও ভোটার তালিকার সিডি সংগ্রহ করেছেন।

উল্লেখ্য, মনোনয়নপত্র উত্তোলন ও জমা দেয়ার শেষ তারিখ ১২ এপ্রিল। যাচাই-বাছাই হবে ১৫-১৬ এপ্রিল এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৩ এপ্রিল। আগামী ২৪ এপ্রিল প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে। আগামী ১৫ মে অনুষ্ঠিত হবে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন।

মেয়র প্রার্থী মো: সানাউল্লাহ জানান, কেন্দ্রীয় নির্দেশেই আসন্ন গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেছি। তবে কোনো দলের হয়ে নয় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করব।

সূত্র: নয়াদিগন্ত

Facebook Comments

comments