সন্তানদের বিসিএস ক্যাডার বানাতে চান প্রতিবন্ধী রিকশা চালক

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে রিকশা চালিয়ে তিন ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে পাঁচজনের সংসার চালাচ্ছেন মো. কবির শেখ (৫০)। কাঠফাটা রোদ কিংবা ঝড় বৃষ্টি কোনো কিছুতেই বিশ্রামের সুযোগ নেই তার।

রিকশার চাকা না ঘুরলে সংসারের চাকা ঘোরে না। একদিন রিকশা না চালালে অর্ধহারে অনাহারে কাটে তার পরিবারের মানুষগুলোর। অদম্য ইচ্ছার জোরেই প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছেন তিনি। স্বপ্ন একটাই ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করার। ছেলে মেয়েরা বিসিএস ক্যাডার হবে এটাই তার আশা।

কবির শেখের আদি বাড়ি পিরোজপুর জেলা সদরের সিআই পাড়ায়। বাবা নুর মোহাম্মদ শেখ (মৃত)। অভাব অনটনের কারণে দেশ স্বাধীনের আগে কাজের খোঁজে বাবা নুর মোহাম্মদ শেখ ছেলে কবির শেখ ও কামাল শেখ এবং স্ত্রী রাশিদা বেগমকে নিয়ে বরিশাল নগরীতে আসেন।

জীবিকার তাগিদে দিনমজুরির কাজ শুরু করেন তিনি। কাজ না থাকলে চকলেট, চানাচুর ফেরি করে বিক্রি করতেন নুর মোহাম্মদ শেখ। দুই ছেলেকে লেখাপড়া শেখানো তো দূরের কথা প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতেই কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে। বাবার কষ্ট দেখে শৈশবেই নিজেও দিনমজুরের কাজ নেমে পড়েন কবির। উপার্জনের অর্থ তুলে দেন বাবার হাতে। শৈশব পেরিয়ে কিশোর বয়সেই রিকশার প্যাডেলে পা রাখতে হয় কবিরকে। সেই থেকে অবিরাম ৩৪ বছর ধরে রিকশা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

কিছুটা স্বচ্ছলতা এলে ১৯৯১ সালে জাহানারা বেগমকে বিয়ে করেন। সংসারে নতুন সদস্য আসায় খরচ বেড়ে যায় কবিরের। সারাদিন রিকশা চালিয়ে কবির যা রোজগার করেন, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। বিয়ের দুই বছর পর তার কন্যা সন্তান ফাতেমা আক্তারের জন্ম হয়। এর কয়েক বছর পর জন্ম হয় দুই ছেলের। অভাব থাকলেও সব মিলিয়ে ভালোই চলছিল সংসার।

কিন্তু হঠাৎ করে ফের সব এলোমেলো হয়ে গেল। ২০১৬ সালে এক দুর্ঘটনায় ডান পা ভেঙে যায়। দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে ডান পায়ে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার হয়। অনেক ধারকর্জ হয়ে যায় চিকিৎসায়। অর্থের অভাবে থেমে যায় চিকিৎসা। ভাঙা পা আর ভালো হয়নি। এর পরের সংগ্রাম অনেক করুণ। কীভাবে দিন যাবে! ঘোর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ভাঙা পা নিয়ে রিকশা চালানো সম্ভব নয়। অর্ধহারে অনাহারে দিন কাটে তার পরিবারের মানুষগুলোর। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের সদস্যদের দু’মুঠো খাবার জোগাড়ে রাস্তার পাশে চায়ের দোকান দিয়ে বসেন কবির।

থাকতেন সরকারি জমিতে ছাপড়া তুলে। সরকারি জমি হওয়ায় এক বছরের মাথায় ছাপড়া ঘর ও ছোট চায়ের দোকানটিও উচ্ছেদ করা হয়। তখন স্ত্রী সন্তান নিয়ে কবির আশ্রয় নেন জেল বাগানের গাছ তলায়। এরপর শুরু হয় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই। কিছুদিন বেকার থাকার পর ধারকর্জ করে ব্যাটারিচালিত রিকশা কেনেন কবির। অদম্য ইচ্ছার জোরে রিকশা চালিয়ে জীবনের চাকা ঘোরানোর চেষ্টা করে চলেছেন তিনি।

কবির শেখ বলেন, ভাঙা পায়ের কারণে এখন আর বেশিক্ষণ রিকশা চালাতে পারি না। রিকশা চালিয়ে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হয়। এ দিয়ে সংসারটা কোনো রকমে চলছে। কবিরের দুই ছেলে এক মেয়ে। মেয়ে ফাতেমা আক্তার বরিশাল নগরীর মানিক মিয়া কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। দুই ছেলে বাপ্পি ও মোবারক নগরীর মথুরনাথ স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে।

ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। তিনি বলেন, ইচ্ছা আছে লেখাপড়া শেখানোর। ছেলে মেয়েরা বিসিএস ক্যাডার হলে জীবনটা স্বার্থক হতো। জানি না কতদিন চালিয়ে যেতে পারব।

কবির শেখ জানান, আদি বাড়ি পিরোজপুর জেলা সদরের সিআই পাড়ায় ১৪ কাঠা জমি পড়েছিল বাবার ভাগে। তবে বাবার মৃত্যুর পর ওই জমি চাচাত ভাইয়েরা দখল করে নেয়। এখন বরিশাল নগরীর ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউনিয়া খান বাড়ি এলাকার একটি ঘরে তিন ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া থাকেন। সরকার গরিবদের সহায়তায় বিভিন্ন ভাতা দেন। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও তার ভাগ্যে ভাতা জোটেনি।

বরিশাল নগরীর ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ সাইদুল হাসান মামুন জানান, কবির শেখ আবেদন করলে সমাজ সেবার প্রতিবন্ধী তালিকায় তার (কবির) নাম অন্তর্ভুক্ত করতে সবধরনের সহায়তা করা হবে।

সূত্র: আরটিএনএন

Facebook Comments

comments