কওমী মাদ্রাসায় যে কারণে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না

আরিফুল ইসলাম

কওমী মাদ্রাসায় পতপত করে উড়ছে লাল সবুজে আকা বাংলাদেশের পতাকা। শিব নারায়ন দাসের মূল ডিজাইনে চারুকলার প্রধান চিত্রশিল্পী কামরুল হাসানের সম্পাদিত ডিজাইনকে কবুল করতে কোন সমস্যা হয়নি কওমী মাদ্রাসার। কিন্তু জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় না কওমী মাদ্রাসায়। আর তাই কওমী মাদ্রাসার দেশপ্রেম নিয়ে তোলা হচ্ছে নানান প্রশ্ন।

প্রথমেই একটা বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করি

রাষ্ট্র এমন একটা বিষয় যা কেবল যুদ্ধে বিজয় অর্জন দ্বারা গড়ে ওঠে না। বরং সেটা কেবল স্বাধীন যাত্রার শুরু হয়। আর স্বাধীন ভুখন্ড নিয়ে নানা চিন্তা ভাবনা এবং ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে রাষ্ট্র। তাই একটি রাষ্ট্র তার প্রারম্ভিক অবস্থায় গনমতামতের প্রতিফলন না ঘটিয়ে যেসব বিষয় তার মূলনীতি হিসাবে গ্রহন করে তাকে সংশোধনের প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। এই কাজটি না করে কোন শাসকগোষ্ঠী যদি রাষ্ট্র পরিচলনায় ব্রতী হয় তবে শাসকের ফ্যসিবাদী চরিত্রের প্রকাশ পায়, যা অনেক সময় রাষ্ট্রের ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়।

এবার মূল আলোচনায় প্রবেশ করি

কওমী মাদ্রাসা এদেশের প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । আর তার শেকড় অত্যন্ত গভীর । এবং জনগনের সাথে এর রয়েছে সুগভীর সৌহার্দমূলক সম্পর্ক। কওমী মাদ্রাসার চেতনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চেতনা। আর তাই সেই চেতনার সাথে রাষ্ট্রীয় চেতনার কোন দ্বন্ধ প্রকাশ পেলে, একথা বলা মোটেই অযৌক্তিক হবে না যে রাষ্ট্র তার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চাওয়ার বিপরীতে গিয়ে ফ্যাসিবাদী চরিত্র প্রকাশ করছে।

কওমী মাদ্রাসা মূলত দ্বীন ইসলাম শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। এবং সেই প্রশ্নে তাদের আপোসহীনতাই তাদের স্বকীয়তা। এবং এই স্বকীয় বৈশিষ্টের কারনেই কওমী মাদ্রাসার প্রতি এদেশের ইসলাম প্রিয় মানুষের নিলোর্ভ ভালবাসা। কিন্তু এই দ্বীনি প্রশ্নের আড়ালে কওমী মাদ্রাসা কি সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে দুষ্ট ? এই প্রশ্ন তথাকথিত বাম ঘরনার ক্ষুদ্র গোষ্ঠী থেকে যেমন বারবার এসেছে, ঠিক তেমনি হীন রাজনৈতিক স্বার্থ আদায়ের উদ্দেশ্যেও বৃহত্তর রাজনৈতিক দলগুলো থেকেও এসেছে। তাই প্রশ্নটির উত্তর সমস্ত ইসলাম প্রিয় জনতার জানা থাকা যেমন জরূরী ঠিক তেমনি জরুরী সংখ্যালুঘু সম্প্রদায়েরও।

আসুন দেখি বাস্তবতা

কওমী মাদ্রাসা ঈমান আকীদার প্রশ্নে দৃঢ়তার ক্ষেত্রে আপোষহীন, কিন্তু এই আপোষহীনতা তাদের কখনোই সংখ্যালুঘু সম্প্রদায়ের অধিকার হরনে তাদের উদ্ভুদ্ধ করেনি। কারন ইসলামই ইনসাফ কায়েমের হুকুম দেয়, এমনকি শত্রুর ক্ষেত্রেও। কওমী মাদ্রাস সংখ্যালুঘুদের কর্মক্ষেত্র বা জাতীয় ক্ষেত্রে তাদের অবদানকে সংকুচিত করার চেষ্টা করেনি কখনোই। আর তাই শিব নারায়ন দাসের মূল ডিজাইনে করা জাতীয় পতাকা যা পরবর্তীতে চারুকলা ইনিস্টিটিউটের প্রধান, চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান কিছুটা পরিবর্তিত করেছিলেন সেটি বিনা আপত্তিতে কওমী মাদ্রাসা মেনে নিয়েছে। এবং বর্তমানে বহু মাদ্রাসাতেই জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। এখানে শিব নারায়নের হিন্দু ধর্ম কিংবা কামরুল হাসানের চিত্রশিল্প কোনটাই বাধা হয়ে দাড়ায়নি। কারন পতাকাটিতে ইসলাম বিদ্ধেষী কিছু ছিল না।

কিন্তু

জাতীয় সংগীতের বিষয়টি সম্পূর্ন ব্যতিক্রম। জাতীয় সংগীত নিয়ে যেসব আপত্তি তা আমি এখানে সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরছি। আশা করি চিন্তাশীল মানুষ চিন্তা করবেন।

১. গানটি মুসলমানদের জন্য উপযোগী নয় , গানটির ভাষার কারনে । রচয়িতা হিন্দু হওয়াটা মূল বিষয় নয়। বরং কোন মুসলামান গীতিকারও যদি এই লাইন গুলো লিখতেন তবে তা মুসলমানদের জন্য উপযোগী হত না। এই গানটির দশ লাইন আমাদের জাতীয় সংগীত হিসাবে গৃহীত হলেও গানটি মূলত দশ লাইনের নয় বরং ২৫ লাইনের। গানটির শেষের দিকের লাইন হল
“ও মা, তোর চরণেতে দিলেম এই মাথা পেতে—
দে গো তোর পায়ের ধুলা,
সে যে আমার মাথার মানিক হবে।”

এই মাথা ঠেকানোর বিষয়টি প্রতীকি অর্থেও কোন মুসলমান কবুল করতে পারে না। রাষ্ট্র যেমন কোন হিন্দুকে দিয়ে গাওয়াতে পারে না ” বাংলাদেশ আল্লাহর দান” ঠিক তেমনি মুসলমানদের দিয়েও গাওয়াতে পারে না যে ” ও মা তোর চরনেতে দিলেম মাথা পেতে”। এটা ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী শিরক। তাই এই গানের কোন অংশই গাওয়া মুসলমানদের জন্য ইসলামী দৃষ্টিতে বৈধ নয়। এতদসত্বেও রাষ্ট্র যদি বিশ্বাসের জায়গায় আঘাত করে কোন নাগরিককে কিছু করতে বাধ্য করে তবে তা ফ্যাসিজম। আর যদি রাষ্ট্রকে সেকুল্যার হিসাবেও মানি তবুও রাষ্ট্রের কর্তব্য ধর্মীয় বিষয়ে আঘাত না হেনে সকল ধর্মের উপযোগী এমন কোন গান নির্বাচন করা।

২. গানটি আমাদের দেশের কোন কবি রচনা করেনি। এবং গানে ব্যবহৃত বাংলার প্রতি ভালবাসা দ্বারা কোনভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্মানিত হয় না। এটা আমাদের স্বাধীনতার চিন্তার বিপরীত। আমাদের জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করব, অভিন্ন বাংলার প্রতি নয়। জাতীয় সংগীতে অভিন্ন বাংলার ধারনা স্থান পাওয়াটা স্বাধীনতার চিন্তার পরিপন্থী। একই সাথে যারা বাংলাদেশী কিন্তু বাঙালী নয় তাদের চেতনার সাথেও বিষয়টি সাংঘর্ষিক।

৩. গানটি ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে রচিত হয়। যার দ্বারা অভিন্ন বাংলার আবেদন করা হয়। অথচ বাংলাদেশ অভিন্ন বাংলার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। এই গানের যে আন্দোলন তাতে আমাদের স্বাধীন পৃথক বাংলা হল বঙ্গের অঙ্গছেদ ধারনা। মনে রাখতে হবে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন ৪৭ এবং ৭১ এর উপর প্রতিষ্ঠিত। অনুরূপ যারা ৭১ অস্বীকার করবে তারা যেমন আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানের তাবেদার হিসাবে দেখতে চায় অনুরূপ যারা ৪৭ কে অস্বীকার করবে তারা মূলত ভারতের তাবেদার হিসাবে আমাদের দেখেতে চায়।

৪. গানটি গগন হরকারার সুরে রচিত। এই ইতিহাস আলোচনা করা হলেও আরেকটি ইতিহাসকে চেপে যাওয়ার প্রবনতা আমাদের তথাকথিত ভারত বান্ধব বুদ্ধিজীবিদের আছে, আর তা হল গগন হরকার থেকে সুর চুরি করার ইতিহাস। এতএব গানটি সুর চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া সত্বেও কিভাবে জাতীয় সংগীত হয় ?

৫. গানটির রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকে সাহিত্য হিসাবে পড়া গেলেও তার মত ব্যক্তির গান জাতীয় সংগীত হিসাবে আপত্তিকর। কেননা ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন শোষক শ্রেনীর জমিদার। গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ কিভাবে একজন শোষক জমিদারের রচিত সংগীতকে জাতীয় সংগীত হিসাবে গ্রহন করে। আমরা যেমন একাত্তরের কোন রাজাকারের রচিত সংগীতকে জাতীয় সংগীত হিসাবে কবুুল করতে পারি না ঠিক তেমনি এদেশের মানুষের উপর যে জমিদার নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত তার রচিত সংগীতকেও জাতীয় সংগী হিসাবে গ্রহন করতে পারি না। কারন এটি আমাদের গনমানুষের ইতিহাসরে সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।

জাতীয় সংগীত একটি জাতির ঐক্যের প্রতীক। তাই জোর করে চাপিয়ে দিয়ে ঐক্য হয় না। বরং সকলের অভিন্ন মতামত যেখানে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব সেখানে আমাদের পৌছতে হবে আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ গঠনের স্বার্থে। জাতীয় সংগীত অপরিবর্তিত কোন বিষয় নয়। জার্মানী , ইরাক , নেপাল , রাশিয়া, পাকিস্তান, নেদারল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা তাদের জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করেছে।

এতএব সর্বশেষ এই কথা বলব একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক কতৃর্ক রচিত সংগীতকে আমাদের জাতীয় সংগীত করা হোক। যে সংগীত সকল ধর্ম বিশ্বাসের এবং বাংলাদেশের বাঙালী বাদেও সকল জাতি গোষ্ঠীর উপযোগী হয়। এমন একটি সংগীত যা আমাদের আগামী দিনে সামনের একটি সুখী সমৃদ্ধ একটি জাতি গোষ্ঠী হিসাবে গঠন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে হবে। যা গাইতে কোন বাংলাদেশীর আপত্তির কোন কারন থাকবে না। জাতীয় পতাকায় যেমন গ্রন্থিত হয়েছে জাতীয় ঐক্য, তদ্রুপ জাতীয় সংগীতেও হোক জাতীয় মুক্তি। হোক ঐকতানের সুর। পরিবর্তনে যদি মিলে মুক্তি তবে সেথায় বাধার প্রাচীর হয়ে না দাড়াক কোন অপশক্তি।

ইনসাফ২৪ এর সৌজন্যে

Facebook Comments

comments