৮ ফেব্রুয়ারি আরেকটি ওয়ান-ইলেভেনও ঘটতে পারে!

বিএনপির নির্বাহীর রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তৃণমূলের নেতারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) আন্দোলনের জন্য তৃণমূল সবসময় প্রস্তুত। ২৪ ঘণ্টার নোটিসেই আমরা যে কোনো কর্মসূচি সফল করতে পারব। এখন ঢাকার নেতাদের জাগতে হবে। ৮ ফেব্রুয়ারি রায় বিপক্ষে গেলে আপনার অনুপস্থিতিতে দল পরিচালনায় নেতৃত্ব নির্বাচনেও সতর্ক হতে হবে। যাতে ওয়ান-ইলেভেনের মতো ঘটনা ঘটলেও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা যায়।’

এ সময় নেতাদের আশ্বস্ত করে বেগম জিয়া বলেন, ‘আমি সব হারিয়ে দেশ ও জনগণের পাশে আছি, থাকব। দলের ভিতরে কেউ হঠকারী সিদ্ধান্ত নিলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সামনের সব কর্মসূচিই শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিকভাবে ঐক্যবদ্ধ থেকে সবাইকে করতে হবে।’

কাউন্সিলের প্রায় দুই বছর পর গতকাল রাজধানীর হোটেল লা মেরিডিয়ানে দ্বিতীয় অধিবেশনের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এসব কথা বলেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্যা। বৈঠকে উপস্থিত ৪৬৭ জনের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের ৪২ জন নেতা বক্তৃতা করেন। বৈঠক থেকে বেরিয়ে একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানা গেছে। সবশেষে দিকনির্দেশনামূলক তিন মিনিটের বক্তব্য দেন বিএনপি প্রধান।

বৈঠকের শেষপর্যায়ে নেতাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, বাইরে বেরোলেই তারা গ্রেফতার হতে পারেন। এ সময় তারা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েই সবাই একযোগে বের হন। সব নেতা বের হওয়ার পর সন্ধ্যা ৬টা ২৫ মিনিটে হোটেল ত্যাগ করেন বেগম খালেদা জিয়া।

জানা যায়, বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাহী কমিটির সদস্যরা একমত হন, দলের সঙ্গে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে, অতীতের মতো এবার আর তাদের ক্ষমা করা হবে না। আর যে কোনো পরিস্থিতিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দলের সংশ্লিষ্ট এলাকার কেন্দ্রীয় নেতা বিশেষ করে সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীদের এলাকায় গিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে। রায় বিরুদ্ধে গেলে রাজপথে থাকার সিদ্ধান্ত হয়। শিগগিরই কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া আগামী নির্বাচনে না যাওয়ারও সিদ্ধান্ত নেন নেতারা। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ছাড়াও কোনো নির্বাচন নয়।

রুদ্ধদ্বার সভায় নোয়াখালী জেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম হায়দার বিএসসি বলেন, ‘বিগত আন্দোলন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা জেলা শহরগুলো অচল করে দিয়েছে। কিন্তু ঢাকার নেতারা জাগতে পারেননি। এবার আগে ঢাকাকে জাগতে হবে। ঢাকা কী করবে, সেই সিদ্ধান্ত আগে জানাতে হবে। আমরা ২৪ ঘণ্টার নোটিসেই যে কোনো কর্মসূচি সফল করতে পারব।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আ ক ন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, ‘ভিত্তিহীন মামলায় আপনাকে কারাগারে নেওয়া হলে কারা দলের নেতৃত্বে থাকবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। বিগত ওয়ান-ইলেভেনের মতো কোনো ঘটনা ঘটলে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা যায়। আপনাকে ছাড়া যারা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তা হবে তাদের জন্য আত্মঘাতী। এটা তাদের জীবনের জন্য হবে ঝুঁকিপূর্ণ।’

নির্বাহী কমিটির সদস্য হেলেন জেরিন খান বলেন, ‘আপনার অনুপস্থিতিতে যারা দলের সঙ্গে বেইমানি করবে, তাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ। আপনি দয়া করে ক্ষমা করলেও তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা এবার ক্ষমা করবে না।’ বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, ‘ম্যাডাম আমরা শপথ নিচ্ছি, ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় আপনি জেলে গেলে আমরাও স্বেচ্ছায় জেলে যাব। বাইরে থাকলে আন্দোলনে বিজয়ী হয়েই আপনাকে মুক্ত করব।’
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘ম্যাডাম আপনার সাজা হলে আমরা নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে নির্বাহী কমিটির সবাই রাজপথে থাকব, অনশন করব। প্রয়োজনে রাজপথ থেকেই জেলেও যাব।’ টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সভাপতি শামসুল আলম তোফা বলেন, ‘আমরা যদি ইমান ও বিশ্বাস নিয়ে কথা ও কাজের মিল রেখে কাজ করি, তাহলে কেউ আমাদের পরাজিত করতে পারবে না।’

নির্বাহী কমিটির সদস্য জিকে গউছ বলেন, ‘অতীতে রাজপথে ছিলাম। ৮ ফেব্রুয়ারি আপনার বিরুদ্ধে যদি ষড়যন্ত্রমূলক কোনো রায় হয়, তাহলে বুকের রক্ত দিয়ে তা প্রতিহত করব।’

কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি হাজী ইয়াসিন বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে কোনো অন্যায় সিদ্ধান্ত এলে ৩০০ সংসদীয় আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রত্যেকে ১০ হাজার নেতা-কর্মী সমর্থক রাজপথে থেকে প্রতিহত করতে হবে।

কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি শরিফুল আলম বলেন, আমরা অন্য কারও নয়, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশে রাজপথে থেকে গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করব।’ বিএনপির সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন বলেন, চেয়ারপারসন আমাদের অনেক দিয়েছেন। এবার তাকে দেওয়ার পালা। আসুন ৮ ফেব্রুয়ারি আমরা সবাই রাজপথে থেকে ঋণ প্রতিশোধ করি।

সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘আমি মা, ভাই ও ছেলে হারিয়েছি। আরেক ছেলে পঙ্গু অবস্থায় বিদেশে চিকিৎসা নিচ্ছে। এরপরও আমি দেশ ও জনগণের পাশে আছি, থাকব। তাদের জন্যই আমার রাজনীতি। আল্লাহ নিশ্চয় আমাদের জন্য সুখবর রেখেছেন। আপনারা কেউ কখনোই হঠকারী সিদ্ধান্ত নেবেন না। শান্তিপূর্ণভাবে কে কত কর্মসূচি পালন করতে পারেন তার ওপর দলে আপনাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্দেশে বলেন, আপনারা দেশ ও জনগণের সেবায় নিয়োজিত। জনগণের জানমাল রক্ষাই আপনাদের কাজ। সরকারের অন্যায় কোনো আদেশ মানবেন না। আপনারা ভালো কাজ করলে আমরাও প্রশংসা করব।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশ ও মানুষকে বাঁচাতে নেতা-কর্মীদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ভয়ভীতি ও লালসার কাছে মাথা নত করা যাবে না। অন্যায়ের সঙ্গেও কোনো আপস নয়। সরকারে পায়ের নিচে মাটি নেই। তাই তারা যা খুশি করছে। কিন্তু আমাদের ধৈর্য হারালে চলবে না।’

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here