মাহমুদুর রহমানের কলাম- ‘আত্মঘাতী নির্লিপ্ততা’

মাহমুদুর রহমান

দিল্লির আনুকূল্যপুস্ট ফ্যাসিস্ট শাসকগোষ্ঠী যে বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষের ঘাড়ে সিন্দাবাদের দৈত্যের মত সওয়ার, এই বার্তাটি গত এক দশক ধরে আমার বক্তৃতা ও লেখালেখিতে বারংবার চিৎকার করে বলে চলেছি। জনগনের মধ্যে সেই বার্তার তেমন কোন দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া না থাকলেও দখলদার সরকার কিন্তু ছেড়ে কথা কইছে না। রাষ্ট্রযন্ত্র তার যাবতীয় বৈধ এবং অবৈধ শক্তির সাহায্যে আমাকে পিষে মারার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এক অসম লড়াইয়ে পরাজয় অবধারিত জেনেও ময়দান থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও সরে যাইনি। সরকারের দোসররা তো বটেই এমনকি আমি যাদের মিত্র বিবেচনা করি তারাও নানারকম নেতিবাচক বিশেষণ দিতে কসুর করছেন না। চরমপন্থী, হঠকারী, ইসলামিস্ট, নির্বোধ, পাগল, কান্ডজ্ঞানশূন্য, গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি দুই কানই খোলা রেখে সকল তিরস্কার এক কানে ঢুকিয়ে অপর কান দিয়ে বের করে দিচ্ছি। আমার যে আর ফিরিবার পথ নাই। তাছাড়া, পরাধীনতার শৃঙ্খল ছাড়া হারানোরই বা আর কী আছে? যাকগে, এটুকু আমার আজকের লেখার মুখবন্ধ। মূল আলোচনা ভিন্ন।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মিডিয়া বর্তমানে সরকারী নির্লজ্জ প্রচারযন্ত্রে পরিনত হয়েছে। সেই সব মিডিয়ায় অবিরত উন্নয়নের জোয়ারের বয়ান শুনতে শুনতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। মাস তিনেক আগে তোপখানার প্রেস কøাবে আমার দেয়া এক বক্তৃতায় আওয়ামী পান্ডারা বেজায় নাখোশ হয়েছে। প্রমানিত ইতিহাসের বাইরে আমি সেই বক্তৃতায় একটি শব্দও উচ্চারণ করিনি। পৃথিবীতে কোথাও ফ্যাসিস্টদের সত্য হজম হয় না। প্রত্যাশিতভাবেই আমার বিরুদ্ধে নতুন করে বিভিন্ন জেলায় ৩৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে এ যাবৎ সরকারের দায়েরকৃত মামলার সংখ্যা একশ সতেরো। নতুন তিন ডজন মামলার সুবাদে আমি জেলায় জেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। পথ চলতে নানা শ্রেনির, নানা পেশার মানুষের সাথে দেখা হচ্ছে, কথা হচ্ছে। তাদের কাছে থেকে দেশের প্রকৃত অবস্থা জানতে পারছি।

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের তাক লাগানো উন্নতি হয়েছে প্রায় সর্বত্র। প্রতিটি জেলাশহরে নতুন চকমিলানো ইমারতের মালিকের পরিচয় জানতে চাওয়াটাই বোকামি। পায়দলে চলা জনগনের পাশ দিয়ে হুশ করে যে সকল কোটি টাকা মূল্যের গাড়ি উড়ে যায় তারও অধিকাংশের মালিক শেখ হাসিনার সোনার ছেলেরা। এ দেশের বার্ষিক বাজেটের সিংহভাগ অর্থ ঢুকে যাচ্ছে তাদের পকেটের পাতালে। অথচ দেশের অর্থনীতি যে রক্তশূন্যতায় ভূগছে সেটা বানিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা বিবেচনা করলেই যে কেউ বুঝবেন, এটুকু বুঝতে তাকে অর্থনীতিবিদ হতে হবে না। একজন আমানতকারী এখন পাঁচ লাখ টাকার চেক নিয়ে ব্যাংকে ঢুকলেও ব্যাংকাররা আঁতকে উঠছেন। অনেক শাখাতেই ওই টাকা দিতেই দিন কাবার হয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, প্রায় সব সরকারী বেসরকারী ব্যাংকগুলোতেই তীব্র তারল্যসংকট বিরাজ করছে। এ দেশের বয়োবৃদ্ধ অর্থমন্ত্রী ফি বছর চার লাখ কোটি, পাঁচ লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষনা করছেন। ভাগ-বাটোয়ারার সংসদে বাজেট বক্তৃতা দেয়ার কালে আমার মত তার কেশশূন্য মস্তক এবং তেলতেলে মুখ বড় বাজেট দেয়ায় আত্মশ্লাঘায় চক চক করে ওঠে। এই ব্যক্তি নিজেকে এবং সম্ভবত: তার নেত্রীকে ছাড়া বাংলাদেশের আর সকল নাগরিককে রাবিশ (জঞ্জাল) অথবা ইডিয়ট (মূর্খ) বিবেচনা করেন। জনগনের পকেট কাটা বিপুল অর্থ যাচ্ছে কোথায় এই প্রশ্ন তাকে করবে এমন সাধ্য কার?

জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালে টেলিভিশনের পরিচিত মুখ, আওয়ামী বুদ্ধিজীবী আবুল বারাকাত একজন নব্য ব্যবসায়ীকেই দিয়েছেন সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। পত্রিকার খবর অনুসারে সেই ব্যক্তি এখন ঋণ খেলাপী। ঋণের টাকা লোপাট হয়ে গেছে। রাজ পরিবারের আত্মীয় জনাব বাচ্চু পুরো বেসিক ব্যাংক হজম করে এখন দেশে-বিদেশে ফূর্তি করে বেড়াচ্ছেন। শেথ হাসিনার আগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর ফার্মার্স ব্যাংকে রক্ষিত আমানতকারীদের টাকা নিজের ধন বিবেচনা করে পকেটস্থ করেছেন। ব্যাংকে লাল বাতি জ¦লে গেছে। আর এক আওয়ামী অর্থনীতিবিদ ড: আতিয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হয়ে জাতীয় রিজার্ভের ডলারের কোন হদিস রাখতে পারেন নি। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের ঘামে ভেজা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার দিয়ে ফিলিপাইনের ক্যাসিনোতে জুয়া খেলা হচ্ছে। ব্যাংক খাতে মন্দ ঋন এবং কু-ঋনের পরিমান এক লক্ষ কোটি টাকায় পৌছে গেছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী সব সম্পদ গিয়ে জমা হচেছ সুইজারল্যান্ড এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ সহ বিশে^র বিভিন্ন ট্যাক্স-হাভেনের (ঞধী ঐধাবহ) অফ-শোর একাউন্টে। পানামা পেপার্স এবং প্যারাডাইস পেপার্সে যাদের নাম এসেছে তারা হয় আওয়ামী নেতা কিংবা তাদেরই অনুগ্রহপুষ্ট ব্যবসায়ী। কানাডা, মালয়শিয়া, ক্যারাবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এবং ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বর্তমান আমলের দূর্নীতিবাজ মন্ত্রী, এমপি, নেতাসহ সশস্ত্র এবং নিরস্ত্র উভয় কিসিমের আমলাদের পরিবারের বসবাসের জন্যে বেগমপল্লী গড়ে উঠেছে। তাদের জৌলুষপূর্ন জীবনধারার ব্যয় নির্বাহের অর্থ জোগান দিচ্ছে এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, পেশাজীবী জনতা। সরকারী খাতের প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয় তিনগুন, চার গুন বাড়িয়ে লুটে নেয়া হচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। এর নামই নাকি উন্নয়নের জোয়ার! জনগনের বিপুল সম্পদ নয়-ছয় করার অপরাধে অর্থমন্ত্রী থেকে শুরু করে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও আমলাদের একমাত্র ঠিকানা হওয়া উচিৎ নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত জেলখানা যেখানে বিনা অপরাধে বেগম খালেদা জিয়াকে বন্দী করে রাখা হয়েছে।

আওয়ামী উন্নয়নের জোয়ারে অর্থনীতির পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থাও রসাতলে গেছে। ভারতের অনুগ্রহপুষ্ট সরকারের শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে আছেন একদা কমিউনিস্ট নুরুল ইসলাম নাহিদ। দেশের শিক্ষার মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়ে ভবিষ্যত প্রজন্মের ভবিষ্যতকে একেবারে ঝরঝরে করার “মহৎ” কাজে উপযুক্ত ব্যক্তিকেই নির্বাচন করেছেন প্রবল ক্ষমতাধর ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী। প্রথমেই এই ব্যক্তি যাদুস্পর্শে অথবা কোন অলৌকিক ক্ষমতাবলে দেশে মেধার বিস্ফোরন ঘটালেন। আমরা সবিস্ময়ে দেখলাম পাশের হারের জ্যামিতিক বৃদ্ধির সাথে জিপিএ এবং গোল্ডেন জিপিএ তে দেশ ছয়লাপ হয়ে গেছে। পাশের হার তরতর করে বেড়ে নব্বই এর ঘরে পৌছে গেল। সবাই বলাবলি করতে লাগলো, সে কী রে বাবা, পাশের হার কি শতভাগ ছুঁয়ে ফেলবে নাকি? শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের অভিধান থেকে কী ‘অকৃৎকার্য’ এবং ‘ঋধরষ’ শব্দদ্বয় নির্বাসনে পাঠানো হবে? কোন কোন প্রবীন শিক্ষাবিদ হঠাৎ এতটা মেধা নিয়ে কিঞ্চিত সন্দেহ প্রকাশ করতেই স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তেলেবেগুনে জ¦লে উঠলেন। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বললেন ওই সব সন্দেহবাতিক, হিংসুটে শিক্ষাবিদরা বর্তমান প্রজন্মের মেধার কাছে দাঁড়াতেই পারবেন না। এই আমলে পরীক্ষা দিলে তারা সবাই নাকি ফেল করবেন! আমি নিজে মাঝারি মেধার মানুষ। প্রায় চার যুগ আগে এস.এস.সি এবং এইচ.এস.সিতে যতটুকু নম্বর জুটেছিল সেটা ভাঙ্গিয়েই বুয়েট এবং আইবিএর বৈতরনী পার হয়েছি। বিদেশেও খানিকটা লেখাপড়ার সুযোগ জুটেছে। এখনকার ছেলে-মেয়েদের নব্বই-পচানব্বই শতাংশ নম্বর প্রাপ্তি আমার কাছে স্বপ্নের মত মনে হয়। আচ্ছা না হয় মেনেই নিলাম প্রধানমন্ত্রী-শিক্ষামন্ত্রীর রাজযোটকের তেলেসমাতিতে রাতারাতি বাংলাদেশে মেধার জোয়ার এসে গেছে। তাই বলে এখন কি প্রশ্নফাঁসকেও মেনে নিতে হবে?

পরীক্ষা শুরুর দুই-তিন ঘন্টা আগে প্রশ্ন এবং উত্তর ভাইরাল করে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। আর বেপরোয়া প্রধানমন্ত্রী গলা উঁচু করে বলছেন এতে কিছু যায় আসেনা। এ রকম প্রশ্ন ফাঁস নাকি বহুকাল থেকেই চলে আসছে। সেই বহুকাল কত কাল আগে আমার জানা নেই। প্রধানমন্ত্রী কোন বছর ম্যাট্রিক, ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছিলেন তাও আমার জানা নেই। তিনি কোন ফাঁস করা প্রশ্নের সাপ্লাই পেয়েছিলেন কিনা সেটা কেবল তারই জানা আছে। তবে প্রশ্ন ফাঁস আমাদের সময়ে যে ছিলনা সেটা হলফ করেই বলতে পারি। আমরা বাকশালী জামানায় গন ঢোকাঢুকি, পরীক্ষার হলে বই খুলে লেখা এ সব কান্ডকীর্তি দেখেছি। কিন্তু, সেই সময়েও প্রশ্ন ফাঁসের কথা কই স্মরনে আসছে না। প্রশ্ন ফাঁসের মূল রহস্য আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। এই ভয়ংকর খেলার একমাত্র উদ্দেশ্য দেশকে মেধাশূন্য করে দেয়া। ভাষা আন্দোলনের প্রধান ছাত্রনেতা এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা মরহুম অলি আহাদ তার “জাতিয় রাজনীতি” নামক রাজনৈতিক আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে- ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে ভারত সরকারের সাথে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গোপন ৭ দফা চুক্তিতে উপনীত হয়। (পৃষ্ঠা-৪৩৩, চতুর্থ সংস্করন) সেই চুক্তির মধ্যে একটি দফা ছিল, ভারতীয় কর্মকর্তারাই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসন চালাবেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রবল জনমতের চাপে তৎকালীন সরকার সাত দফা চুক্তি বাস্তবায়ন করতে সমর্থ হয়নি। অবশ্য ইন্দিরা গান্ধীকে সন্তুষ্ট করতে মরহুম শেখ মুজিবর রহমান ওই চুক্তির পরিবর্তে ২৫ বছর মেয়াদী বিতর্কিত বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীচুক্তি করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের প্রশাসন ভারতীয় কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালনা করার যে আকাঙ্খা সেই সময় ইন্দিরা গান্ধীর ছিল সম্ভবত: এতকাল বাদে সেটা বাস্তাবয়ন করতেই সুপরিকল্পিতভাবে দেশের শিক্ষা ব্যাবস্থা পর্যায়ক্রমে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। গনহারে জিপিএ ফাইভ প্রদান, প্রায় শতভাগ পাশ করানো, বিতর্কিত সিলেবাস প্রনয়ন এবং সর্বশেষ প্রশ্ন ফাঁস এসব বাংলাদেশের মানবসম্পদ বিনাসী দীর্ঘমেয়াদী চক্রান্তেরই বিভিন্ন ধারা। এ দেশে বিদেশী বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের সকল উচ্চ পদ ইতোমধ্যে ভারতীয়দের দখলে চলে গেছে। এমনকি দেশীয় বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও ত্রমশ: ভারতীয় পেশাজীবীদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। আমি নিশ্চিত যে বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের প্রকৃত সংখ্যা বিনিয়োগ বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, পুলিশ প্রশাসন কেউই সঠিকভাবে দিতে পারবে না। আমাদের ছেলে-মেয়েদের কর্মক্ষেত্র আশংকাজনকভাবে সংকুচিত হয়ে আসছে। শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসসাধন প্রক্রিয়াদৃষ্টে মনে হচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে তাদের জন্যে চাকরীর দরজা একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে।

বিষ্ময়ের ব্যাপার হলো, চোখের সামনে অনিবার্য সর্বনাশ দেখতে পেয়েও অভিভাবক শ্রেনি অথবা ছাত্রসমাজ করো মধ্যেই কোন প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান হচ্ছে না। শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বগ্রাসী দূনীতিতেও যেন তাদের কিছু যায় আসেনা। দুর্নীতিগ্রস্থ সিস্টেমের মধ্যে থেকেই আপন সন্তানকে সাময়িক লাভবান করবার জন্যে অভিভাবকরা পর্যন্ত ফাঁস হওয়া প্রশ্নের পেছনে ছুটছেন। এ কী ভয়াবহ নির্লিপ্ততা ও স্বার্থপরতা? এই কলুষিত সিস্টেমে একটি বা দুটি পরীক্ষায় বেশি নম্বর তাদের সন্তানদের কর্মজীবনে কোন উপকারেই যে লাগবে না এই সহজ সত্যটি তারা বুঝতে পারছেন না। সমাজে ঘোরােেফরা করলে একটি বক্তব্য এখন প্রায়ই শোনা যায়।

“আমরা ভাই ছা পোষা মানুষ, রাজনীতির বাইরে আপন পরিবার নিয়ে থাকতে পারলেই খুশী। ভোট, গনতন্ত্র, স্বাধীনতা এ সব বড় বড় কথা যারা দেশ চালান তারাই বুঝবেন। আমরা কোন দল-টল করতে চাই না।”
পুরো জাতির মধ্যে কখন যেন এক প্রকার ভীরু, পরাজিত, দাসসুলভ মানসিকতা গভীরে ঢুকে গেছে। তাদের জগৎ ছোট্ট গৃহকোনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আমি দীর্ঘদিন কাশিমপুর কারাগারে বন্দী ছিলাম। বাংলাদেশের নির্লিপ্ত মানুষদের দেখলে আমার মনে হয় জেলের বাইরেও তারা যেন স্বেচ্ছায় বন্দীত্ব মেনে নিয়েছেন। একটি গোটা জাতিকে বিনা যুদ্ধে এভাবে বশ্যতা স্বীকার করানোই দিল্লির সবচেয়ে বড় সাফল্য।

কেবল আমজনতাকে দোষ দিয়েই বা কী হবে? বাংলাদেশের আমলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সেনাবাহিনী সকল শ্রেনিই কি নির্লিপ্ততার ভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি। দেশের স্বাধীনতা কি প্রকারে এবং কতখানি দিল্লির কাছে বিকিয়ে দেয়া হয়েছে তার প্রত্যক্ষদর্শী তো প্রজাতন্ত্রের এই সব কর্মকর্তারাই। বিদেশী শক্তির ক্রীড়নক, জনগনের ম্যান্ডেটবিহীন এক ফ্যাসিস্ট শাসকগোষ্ঠী জনগনের উপর জুলুমের স্টিমরোলার চালিয়ে যাচ্ছে এই আমলাতন্ত্রেরই মদদে। পাঁচ বছরের জেল জীবনে অসংখ্যবার পুলিশ এসকর্ট দিয়ে আমাকে কারাগার থেকে আদালতে আনা-নেওয়া করা হয়েছে। যে সকল পুলিশ সদস্য এসকর্টের দায়িত্বে থাকতেন তাদের সঙ্গে যাওয়া-আসার পথে কথা-বার্তাও হয়েছে অনেক। কনস্টেবলরা পর্যন্ত গর্বের সাথে কতদিন বলেছে যে এই সরকারকে তারাই টিকিয়ে রেখেছে। একই কথা ভিন্ন ভাষায় পুলিশের বড় কর্তারা হর-হামেশা বলছেন। আইনশৃঙ্খলা বহিনীর এই সব সদস্যদের মধ্যে বেপরোয়া ক্ষমতার উন্মত্ততা ব্যতীত আর কোন বোধের অস্তিত্ত্ব বোধ হয় আর নেই। দেশের স্বাধীনতা, জনগনের অধিকার, প্রজাতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতা, এ সকল আদর্শ তাদের কাছে অর্থহীন। রোবটের মত তারা কেবল রিমোর্ট কন্ট্রোল দ্বারা পরিচালিত হচ্ছেন। সেই রিমোর্ট কন্ট্রোল দিল্লি থেকে চালানো হচ্ছে।

বৈধ বন্দুকধারীদের আরো বৃহৎ, শক্তিশালী এবং সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠান সেনাবাহিনীতেও একই নির্লিপ্ততার ভাইরাস। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফসল বিডিআর বিদ্রোহের নামে সেনাবাহিনীর অর্ধ শতাধিক দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের দিনে দুপুরে, দফায় দফায় হত্যা করা হলে অন্যরা নীরবে কেবল অশ্রুপাত করেছেন। সাবেক সেনাপ্রধানের বিধবা স্ত্রীকে আইনানুগভাবে প্রাপ্ত তার দীর্ঘকালের বাসগৃহ থেকে বশংবদ আদালতের সহযোগীতায় অমানবিকভাবে বের করে দেয়া হলে তারা অন্যদিকে চেয়ে থেকেছেন। দেশের স্বাধীনতা বিসর্জিত হয়, প্রধান বিচারপতিকে অস্ত্রের মুখে দেশ থেকে বিতারিত করা হয়, দেশের সম্পদ লুটের মহোৎসব চলে, কিন্তু সুশৃঙ্খল বাহিনীর নির্লিপ্ততায় কোন চিড় ধরে না।

সমাজের সকল স্তরে এই নির্লিপ্ততা আত্মঘাতী। এমন বিবেক বিবর্জিত, বিচারবুদ্ধিহীন ভীরু নির্লিপ্ততা নিয়ে কোন জাতি টিকে থাকতে পারে না। মেরুদন্ডহীন কোন জাতির টিকে থাকার আসলে দরকারও নেই, উচিৎও না। লিখতে গিয়ে কৈশোরে শোনা এক হাদিসের কথা মনে এলো। হাদিসটি সহি না জয়িফ আমি জানি না। হাদিসটির মর্মার্থ আমার লেখার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হওয়ার কারনেই উল্লেখ করছি।

প্রাচীনকালে সোডম ও গোমোরাহ নগরীতে অশ্লীলতা এমন সীমা অতিক্রম করে যে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে। নবী লূত (আ.) চরম বিপথগামী এই জনগোষ্ঠীকে হেদায়েতের জন্যে প্রানপণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। অবধারিত ভাবে একসময় আল্লাহর গজব নেমে আসে। আল্লাহর আদেশে জিবরাইল (আ.) পাপের নগরীদ্বয় ধ্বংস করতে আসেন। লূত (আ.) কে গুটিয়েক আত্মীয়-পরিজন সহ সোডম ও গোমোরাহ ত্যাগ করতে বলেন জিবরাইল (আ.)। আল্লাহর নির্দেশ প্রতিপালনের আগে ফেরেশতা দেখলেন যে দুই নগরীতে আারো কিছু ইবাদতে-বন্দেগীতে রত ব্যক্তি রয়ে গেছেন। তিনি আল্লাহর কাছ থেকে এদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানতে চাইলেন। আল্লাহ বললেন, ওদেরসহ নগরী উল্টে দাও। এরা কেবল নিজে নিরাপদে থেকে ইবাদত করেছে। অন্যায়ের কোন প্রতিবাদ করে নাই। নির্বিচার জুলুম দেখেও নির্লিপ্ত থাকার কারনে ওরাও জুলুমের সহযোগী। জিবরাইল (আ.) পরহেজগার ব্যক্তিদেরসহ সোডম এবং গোমোরাহ ধ্বংস করে আল্লাহর নির্দেশ পালন করলেন।

আজ নেপাল এবং শ্রীলংকা ভারতীয় আধিপত্যবাদের শৃঙ্খল ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মুক্ত জাতি হয়ে আল্লাহর জমিনে উন্নত শিরে দাঁড়িয়েছে। মালদ্বীপের জনসংখ্যা পাঁচ লাখেরও কম, অথচ তারাও সাহস করে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহন করেছে। পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ একমাত্র রাষ্ট্র যার সরকার বিনা প্রতিবাদে দিল্লির সকল হুকুম পালন করে চলেছে। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্মলাভ করা স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের ষোল কোটি নাগরিক এত সহজে পরাভব মেনে নিতে পারে না। আমি এখনও আশাবাদী যে, নিরস্ত্র জনতা মেরুদন্ড সোজা করে নীরব প্রতিবাদে একবার পথে নেমে এলেই জালিমের হাত থেকে মুক্তি মিলবে। কাতার বেধে আগুয়ান কোটি জনতার ঢেউকে প্রতিহত করতে পারে এমন ক্ষমতা কোন অজনপ্রিয় শাসকশ্রেণির থাকতে পারেনা। দেশপ্রেমিক লড়াকু জনতার অপ্রতিরোধ্য শক্তির কাছে সব কালে সকল ফ্যাসিস্টদের মাথা নোয়াতেই হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “এবার ফিরাও মোরে” কবিতার কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করে লেখাটি শেষ করছি:
“ এই-সব মৃঢ় ম্লান মূক মুখে
দিতে হবে ভাষা; এই-সব শ্রান্ত শুস্ক ভগ্ন বুকে
ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা; ডাকিয়া বলিতে হবে-
‘মুহূর্ত তুলিয়া শির একত্র দাঁড়াও দেখি সবে;
যার ভয়ে তুমি ভীত সে অন্যায় ভীরু তোমা-চেয়ে,
যখনি জাগিবে তুমি তখনি সে পলাইবে ধেয়ে।
যখনি দাঁড়াবে তুমি সম্মুখে তাহার তখনি সে
পথকুক্কুরের মতো সংকোচে সত্রাসে যাবে মিশে।”

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ

সূত্র: RBN24

Facebook Comments

comments