‘প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচন’ নাকচ করেন ওয়াহহাব মিঞা

মিজানুর রহমান খান

ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ে পদত্যাগী বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন, তাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে গত বুধবার নির্বাচনকালীন সরকারের পক্ষে যেসব যুক্তি দেন, তা নাকচ হয়ে যায়।

ওই রায়ে বিচারপতি এম এ ওয়াহ্হাব মিঞা বলেছিলেন, ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে প্রবর্তন করা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুরোপুরি সংবিধানসম্মত এবং বাংলাদেশের বিরোধপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর অধীনে নির্বাচন করার কোনো বিকল্প নেই। কোনোভাবেই এটা গণতন্ত্র, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার পৃথক্করণ, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি।’

২০০৬-০৮ সালে সেনাসমর্থিত কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থার অপব্যবহারের জন্য তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে অভিযুক্ত করেন। তিনি বলেন, ব্যর্থতা ব্যক্তির, ব্যবস্থার নয়।

বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের দ্বারা নির্বাচনকালীন সরকারের পক্ষে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর আসীন থাকার ধারণা দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। নির্বাচিত ও অনির্বাচিতদের যুক্তি খণ্ডন করে তিনি লিখেছিলেন, ‘সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরে প্রধান উপদেষ্টা ও বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা সমান্তরাল হয়ে যায়। ক্ষমতাসীন দল যদি সরকারি প্রশাসনকে ব্যবহার করে কারচুপি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজেদের নির্বাচিত ঘোষণা করে, তাহলেও তাদের সংবিধানের ৬৫ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচিত বোঝাবে না। তেমন সংসদকে সত্যিকার অর্থে বৈধ বা সার্বভৌম বলা যাবে না। সেই সংসদের জনপ্রতিনিধিত্ব চরিত্র থাকবে না। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্বপ্ন তারা বাস্তবায়ন করতে পারবে না।’

ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ে ২০১২ সালে প্রকাশিত ওই পর্যবেক্ষণের পাঁচ বছর পরে বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা ২০১৭ সালের ৩ জুলাই আলোচিত ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়েও পুনরায় লিখেছিলেন, ‘ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, একটি “পোশাকি গণতন্ত্র” “প্রকৃত গণতন্ত্রকে” ধ্বংস করে দিয়েছিল।’

নির্বাচনকালীন সরকারের যে ধারণা সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার দিয়েছেন, তার বিপরীতে একটা জোরালো ব্যাখ্যা তাঁর রায়ে উল্লিখিত আছে বলে মনে হয়। শেখ হাসিনা সংসদে পুনরায় বিএনপির ‘সহায়ক সরকারকে’ সংবিধান পরিপন্থী বলেছেন। আর বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা বিলুপ্ত হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেই বাংলাদেশের জন্য একান্ত দরকারি মনে করেছিলেন।

ক্ষমতাসীন দল থেকে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচন হওয়ার বহুল ব্যবহৃত উদাহরণের বিরুদ্ধে তাঁর উত্তর, ‘অন্তর্বর্তীকালীন বা নিয়মিত সরকারের ধরন কী হবে তা প্রতিটি জাতি তার প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট করে এবং তা নিয়ে তাদের গর্বিত হওয়ারও সুযোগ থাকে। নির্বাচনকালে মন্ত্রিসভা ক্ষমতায় থাকলে দলের সঙ্গে তাদের শক্তিশালী সংশ্লিষ্টতা থাকে। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা তাঁদের সব ধরনের সরকারি সুবিধাসহ নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। এ কারণে জনপ্রশাসন তাঁদের প্রভাবে নাজুক থাকে এবং এ কারণে তাঁরা নির্বাচনে কারচুপি করতে সক্ষম হন। অথচ অরাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার সেভাবে প্রভাবিত হওয়ার কারণ থাকে না।’

ত্রয়োদশ সংশোধনী একটি সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা তাঁর রায়ের উপসংহারে মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে একবাক্যে সহমত পোষণ করেছিলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। মামলার রায়ে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের দ্বারা রায় পরিবর্তনের বিষয়েও তিনি ভিন্নমত দিয়েছিলেন।

লক্ষণীয় যে ষোড়শ সংশোধনীর সর্বসম্মত রায়ে তিনি আরও লিখেছিলেন, সংসদের পাস করা আইন বাতিলে আদালতের এখতিয়ারের বিধান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই করে গেছেন, যা পরে কখনো খর্ব করা হয়নি। ২০১৪ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ১৬ তম সংশোধনী না থাকার যুক্তিও তিনি তাঁর রায়ে দিয়েছিলেন।

পদত্যাগী বিচারপতি এম এ ওয়াহ্হাব মিঞা সংসদের উদ্দেশে নির্দিষ্টভাবে এই মন্তব্যও করেছিলেন যে, ‘সংবিধানের সংশোধনী দুধভাতের মতো হওয়া উচিত নয়। আমি এটা বলছি কারণ ৩০ জুন ২০১১ সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পাস করানো হয়েছিল, সেটা মাত্র ৩ বছর ২ মাস ১০ দিন যেতেই ১৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাতিল করা হলো।’

জামালপুরের মাদারগঞ্জ থেকে তিনি ময়মনসিংহ বারে ১৯৭৪ সালে একজন সাধারণ আইনজীবী হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন। ঢাকায় তাঁর দীর্ঘকালীন সিনিয়র ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী টি এইচ খান। ছাত্রজীবনে কোনো সংগঠন করেননি। দুই ছেলে (প্রকৌশলী ও আইনজীবী), এক মেয়ে (ব্যাংকার)। স্ত্রী গৃহবধূ। উত্তরায় প্লট পেয়েছিলেন, এখনো খালি পড়ে আছে। ঢাকায় বাড়ি নেই।

আওয়ামী লীগ আমলে গত ৯ বছরে অনেক পর্যবেক্ষকের মতে ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ তৃতীয়বারের মতো আপিল বিভাগের প্রবীণতম বিচারককে ডিঙিয়ে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা হয়েছে। এর আগে একজন বিচারককে একাধিকবার ডিঙানোর পরেও তাঁর প্রধান বিচারপতি হওয়ার নজির ছিল। কিন্তু বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞার অবসরে যাওয়ার তারিখ ছিল আগামী ১০ নভেম্বর। আর নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতির অবসরের তারিখ ২০২১ সালে। তাই বিচারপতি এম এ ওয়াহ্হাব মিঞার পক্ষে প্রধান বিচারপতি হওয়ার সম্ভাবনা আর নেই।

এর আগে ২০১০ সালে বিচারপতি এম এ মতিনকে ডিঙিয়ে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে প্রধান বিচারপতি করা হয়। এর প্রতিবাদে বিচারপতি এম এ মতিন আর আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এজলাসে বসেননি। অপর বিচারপতি শাহ আবু নইম মোমিনুর রহমানকে ডিঙিয়ে ২০১১ সালে বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেনকে প্রধান বিচারপতি করার পরদিন তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। একটি মাত্র বাক্যে তিনি তাঁর পদত্যাগপত্র লিখেছিলেন। তিনি তাঁর পদত্যাগপত্রে কোনো কারণ ব্যাখ্যা করেননি বলে জানা গেছে।

বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতির চেয়ে দেড় বছর আগে শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে হাইকোর্টে অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। পদত্যাগী বিচারপতি এম এ ওয়াহ্হাব মিঞা ও নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি যথাক্রমে ১৯৯৯ সালে এবং ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম হাইকোর্টের বিচারক হন। এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১ উভয়ে একই দিনে আপিল বিভাগের বিচারক নিযুক্ত হয়েছিলেন।

সূত্র: প্রথম আলো

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here