পুলিশে আতঙ্ক, একা একা চলাচলে বারণ

খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায়কে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিতিশীলতাসহ ছয় ধরনের পরিস্থিতি হতে পারে বলে পুলিশকে সতর্ক করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গত বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি দেশের সব পুলিশ সুপারের কাছে পাঠানো হয়। এসব পরিস্থিতি হলে কী করতে হবে, সে ব্যাপারেও চিঠিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্র এ কথা নিশ্চিত করেছে।

এদিকে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী একটি সূত্র জানায়, ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি যে বিপুল মানুষের জমায়েত করতে চায়, তা ঠেকাতে দলটি বদ্ধপরিকর। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি দলীয় নেতা-কর্মীদেরও প্রস্তুত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল রোববার গুলশান ইয়ুথ ক্লাবে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের এক বর্ধিত সভায় বলেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনো ধরনের নাশকতা-নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি হতে দেবে না। কেউ নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করলে আওয়ামী লীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠিতে যেসব আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো হলো অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে দুষ্কৃতকারীরা ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় শহরের দিকে আসতে পারে। তারা ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে পারে। পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালাতে পারে। নাশকতা করতে পারে। গণপরিবহনে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে। এমনকি কেপিআইভুক্ত সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও রেলপথে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করতে পারে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ৮ ফেব্রুয়ারির রায়কে ঘিরে কেউ যাতে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সে ব্যাপারে সবাই প্রস্তুত রয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, নাগরিক জীবন বিপর্যস্ত হবে, এমন কোনো ঘটনা সেদিন ঘটবে না।

পুলিশ সুপারদের কাছে পাঠানো চিঠিতে পরিস্থিতির মোকাবিলায় ১৮ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্য রয়েছে, কৌশলগত স্থানে নিরাপত্তা বাড়ানো, চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করা, থানাসহ পুলিশের সব স্থাপনায় নিরাপত্তা বাড়ানো, পুলিশের সব সিসি টিভি ক্যামেরা সচল রাখা, প্রয়োজনে ক্যামেরা ভাড়া করা, যেসব স্থানে আগে নাশকতার ঘটনা ঘটেছে, সেসব স্থান চিহ্নিত করা, গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে বাড়তি নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, টহল বা অভিযানে পুলিশ সদস্যরা যেন একা একা না যান। টহলের সময় সবাইকে একসঙ্গে থাকার কথা বলা হয়েছে। এমন নির্দেশনায় পুলিশে আতঙ্কও তৈরি হয়েছে।

এদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে ক্যামেরা রাখতে বলা হয়েছে, যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তাঁরা ছবি তুলে রাখতে পারেন এবং সেই ছবি আদালতে উপস্থাপন করতে পারেন। ছবি জোগাড় করতে গণমাধ্যমকর্মীদের সাহায্য নেওয়ার কথাও বলা হয়। একই সঙ্গে এ ধরনের তৎপরতার বিরুদ্ধে জনমত গড়তে পেশাজীবী ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করতে পুলিশ কর্মকর্তাদের পরামর্শ দেওয়া হয়।

পুলিশের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ৮ ফেব্রুয়ারির রায়কে ঘিরে কেউ যাতে রাজপথে কোনো নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সে ব্যাপারে কঠোর থাকবে পুলিশ।

ইতিমধ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়েছে। গত মঙ্গলবার থেকে এই ধরপাকড় শুরু হয়। ছয় দিনে বিএনপির ৬৪০ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করেছে পুলিশ। এর বাইরে অনেক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

হুমকি আমলে নিচ্ছে না আওয়ামী লীগ

দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যেসব শর্ত না মানলে আন্দোলনের যে হুমকি দিয়েছেন, তা অনেকটাই আমলে নিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। এটাকে খালেদা জিয়ার দল চাঙা রাখার কৌশল হিসেবে মনে করছে সরকারি দল।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজা হতে পারে জেনেও খালেদা জিয়া নির্বাচনের মাঠ ছাড়তে রাজি নন, নির্বাহী কমিটির বৈঠক থেকে এটা বোঝা গেছে। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যে পদ্ধতিতে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হয়েছে, আগামী নির্বাচনও একই পদ্ধতিতে হবে। বিএনপিকে এই বাস্তবতা মেনেই নির্বাচনে অংশ নিতে হবে।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, খালেদার রায়ের দিন বিএনপি কেন বড় জমায়েত করতে চায়, এটা নিয়ে নানা মত-বিশ্লেষণ আছে সরকারি দলে। কেউ কেউ বলছেন, দলকে চাঙা করার জন্য এবং জনপ্রিয়তা বোঝানোর জন্য ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ সারা দেশে বিপুল মানুষ নামাতে চায় বিএনপি। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, খালেদার রায়কে কেন্দ্র করে মাঠ দখলে নিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাইছে বিএনপি। ফলে কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে বিএনপিকে মাঠে নামতে না দেওয়াকেই অধিক নিরাপদ মনে করছে আওয়ামী লীগ।

ওই সূত্র বলছে, বিএনপির উদ্দেশ্য যা-ই হোক, রায়ের আগে-পরে মাঠে নেমে শক্তি দেখাতে পারলে দুর্বল বিএনপি সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে এবং মানুষের সহানুভূতি পাবে। তাই আওয়ামী লীগের জেলা, মহানগর ও উপজেলা কমিটিগুলোকে নিজ নিজ কার্যালয়ে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা রাস্তায় নেমে মিছিল বা শোডাউন করবেন না।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের অন্যতম মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, একটা দুর্নীতির মামলার রায় নিয়ে এত হইচই হওয়ার কোনো কারণ নেই। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকার ব্যাখ্যা কী, জানতে চাইলে হানিফ বলেন, কেউ সহিংসতা ও জানমালের ক্ষতি করার চেষ্টা করলে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে আওয়ামী লীগ।

সূত্র: প্রথম আলো

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here