স্বাধীনতা যুদ্ধে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে সংগঠিত যুদ্ধসমূহ

লিখেছেন: বৈরাম খাঁ

২৬শে মার্চ ১৯৭১ সালে মেজর জিয়া বিদ্রোহ করে, সেদিনই তার পাকিস্তানী উর্ধ্বতন কর্মকর্তা লেঃ কর্নেল জানযুয়াকে এ্যারেষ্ট করে এবং সবার মিলিত সিদ্ধান্তে গুলি করে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধে ওই প্রথম কোন পাকিস্থানী সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিরোধ শুরু হয় এবং সেটা মেজর জিয়ার হাত দিয়েই প্রথম কোন শত্রু অফিসার হত্যার মধ্যে দিয়ে। সে সময় শহীদ জিয়া তদানিন্তন পাকিস্তানের অষ্টম ইষ্ট বেঙ্গলের উপ অধিনায়ক ছিলেন। কালুরঘাট প্রতিরোধ যুদ্ধের বাংলাদেশী সৈন্যদের সাহসিকতা ঐতিহাসিক ষ্ট্যালিনগ্রাডের প্রতিরোধ যুদ্ধের পাশে স্থান করে নেয়।

মীরেরসরাই যুদ্ধ

২০শে এপ্রিল, শহীদ জিয়ার শারিরীক তত্ত্বাবধানে ক্যাপ্টেন অলির নেতৃত্বে মীরেরসরাই ঢাকা চিটাগাং মহাসড়কে প্রায় বিশটি পাকিস্তানী যানের সামরিক কনভয় কে ধ্বংস করে দেয়।

মস্তান নগর যুদ্ধ

২১ শে এপ্রিল বেলা ১১ টায় পাক বাহিনী মীরেরসরাই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে মস্তান নগর জিয়ার মুক্তিবাহিনীর ওপর মারাত্মক আক্রমন করে। মহাসড়কটি ক্যাপ্টেন অলির নিয়ন্ত্রনে ছিল। কৌশলি যুদ্ধে পাক বাহিনী আবারো মার খায়। পাক বাহিনী পিছু হটে সেখানে ক্যাপ্টেন মতিনের কোম্পানীর মুখোমুখি হয় সেখানেও ব্যাপক মার খায়। যুদ্ধের শুরুতেই এ রকম আক্রমন পাক বাহিনীর ইজ্জতের প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়। রি ইনফোর্সমেন্ট এনে টানা দশ ঘন্টা তারা মস্তান নগরের ওপর শেল মারে এবং পরে জিয়ার নির্দেশে ক্যাপ্টেন অলি এবং মতিন কৌশলগত পিছু হটে হিংগুলী অবস্থান নেয় এবং পরে পাক বাহিনী সে এলাকা দখল নেয়।

হিংগুলী যুদ্ধ

২২ শে এপ্রিল মেজর জিয়ার নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন অলি পাক বাহিনীকে হিংগুলি আক্রমনে টোপ ফেলে, কিন্তু মাস্তান নগর যুদ্ধে মার খেয়ে পাক বাহিনী বিশাল শক্তি সমাবেশ করে মুক্তিবাহিনীকে আক্রমনে এগুতে থাকে। এখানে ভারতীয় বাহিনীর মেজর প্রধান সহায়তায় ২৩শে এপ্রিল হিংগুলি ব্রীজ উড়িয়ে দেয়া হয়। ব্যাপক যুদ্ধে স্বল্প শক্তির মুক্তি বাহিনী কৌশলগত পিছু হটে হিয়াকুতে অবস্থান নেয়।

হিয়াকু যুদ্ধ

২৭শে এপ্রিল পূর্ন শক্তির এক ব্যাটেলিয়ন পাক বাহিনী হিয়াকু আক্রমন করলে উভয় পক্ষে ব্যাপক যুদ্ধ বেধে যায়। এখানে ক্যাপ্টেন এজাজ ক্যাপ্টেন অলির সাথে যুদ্ধ করে। মেজর জিয়ার নির্দেশে আবারো পিছু হটে মুক্তিবাহিনী চিকনছড়া অবস্থান নেয়।

চিকনছড়া যুদ্ধ

৩০শে এপ্রিল মেজর জিয়া, মেজর শওকত ও ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চিকনছড়া অবস্থান করে এক ঘন্টা শত্রুর অবস্থান পর্যবেক্ষন করে আক্রমনের ছক আকে। দুপুর এক টায় পাক বাহিনী চিকনছড়া আক্রমন করলে, প্রতিটা মুক্তিযোদ্ধা জীবনবাজি রেখে ফাইট করে। এক পর্যায়ে পাক বাহিনী পিছন সরতে বাধ্য হয় সাথে নিয়ে যায় দশ জন পাক সেনার লাশ। এদিকে একজন মুক্তিযোদ্ধাও নিহত হয় না।

বেলুনিয়া যুদ্ধ

২৪ শে মে মেজর জিয়া ক্যাপ্টেন অলি কে নির্দেশ দিলেন বেলুনিয়ায় ডিফেন্সিভ পজিশান নিতে। এখানে তার সুচতুর পরিকল্পনায় পাক বাহিনীকে ট্রাপ করা হয়। এখানে ৭৬ জন পাক সৈন্য নিহত হয়। ভারতীয় বাহিনীর জেনারেল শাবেদ সিং নিজে এ যুদ্ধ প্রতক্ষ্য করেন এবং স্বীকার করতে বাধ্য হন জিয়া তার দেখা শ্রেষ্ঠ কমব্যাট সোলজার।

(২৪শে মে থেকে ১৬ ই জুনের মাঝে বেশ কিছু যুদ্ধ হয়। কিন্তু রেফারেন্স না পাওয়ায় এখানে উল্লেখ করা হয়নি। তবে যুদ্ধ যে হয়েছে তা নিশ্চিত বিভিন্ন লেখার সুত্র থেকে।)

জুন মাসের ২২ তারিখ বাংলাদেশ সরকারের প্রথম নিয়মিত ব্রিগেড তৈরী হয়। কে ফোর্স, যেড ফোর্স, এস ফোর্স নামে এ তিনটি ব্রিগেড পরিচিত। জিয়া ছিলেন যেড ফোর্সের অধিনায়ক।

যেড ফোর্স

ব্রিগেড সদর দফতরঃ তেল ঢালা (মেঘালয়, ভারত)
কমান্ডারঃ লেঃ কর্নেল জিয়াউর রহমান (জুলাই – ডিসেম্ভর ৭১, মেজর জিয়া পাকিস্তান আর্মিতে বিদ্রোহ করে বাংলাদেশ সরকারের অধীনে যুদ্ধরত অবস্থায় অস্থায়ী সরকার কর্তৃক প্রমোশান পেয়ে লেঃ কর্নেল হিসাবে পদোন্নতি পায়)
ব্রিগেড মেজরঃ ক্যাপ্টেন অলি আহাদ
ডিএ,কিউ এম জিঃ ক্যাপ্টেন সাদেক হোসেন
ব্রিগেড সিগন্যাল অফিসারঃ ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম
ব্রিগেড মেডিকেল অফিসারঃ ডাঃ হুমায়ুন হাই, ডাঃ প্রেমাংকুর রায়।

যেড ফোর্সের যুদ্ধ এলাকা

লেঃ কর্নেল জিয়ার নেতৃত্বে যেড ফোর্স গঠিত হবার পরই সেন্ট্র্যাল কমান্ড থেকে নির্দেশ আসে বৃহত্তর ময়মনসিংহ এবং টাঙ্গাইল জেলায় সামরিক অপারেশানের । জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার সাথে যেড ফোর্সের যুদ্ধ কালীন এলাকা বাড়িয়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার করা হয়। চুড়ান্ত যুদ্ধে সিলেট পাক বাহিনী লেঃ কর্নেল জিয়ার কাছেই অস্ত্র সমর্পন করে। যেড ফোর্স ৪, ৫ এবং ১১ নাম্বার সেক্টরে যুদ্ধ করে। যেড ফোর্সের উল্লেখ্য যোগ্য যুদ্ধ সমুহ নিম্নরূপ – কামালপুর যুদ্ধ, বাহাদুরাবাদ ঘাট অপারেশান, দেওয়ানগঞ্জ থানা আক্রমন, চিলমারী যুদ্ধ, হাজীপাড়ার যুদ্ধ, ছোট খাল, গোয়াইন ঘাট, টেংরাটিলা গোবিন্দগঞ্জ, লামাকাজি, সালুটিকর বিমানবন্দর, ধলই বিওপি, ধলই চা বাগান, ধামাই চা বাগান, জকিগঞ্জ, অলি ময়দান, এম সি কলেজ, ভানুগাছা, কানাইঘাটা, ফুলতলা চা বাগান, বড়লেখা, লাতু, সাগরনাল চা বাগান, ছাতক ও রাধানগর যুদ্ধ উল্লেখ্যযোগ্য (স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিল পত্র, দশম খন্ড, পৃষ্ঠা ৬৮২)

যুদ্ধ কালীন সময়ে ইনি জিয়ার অধীনে যুদ্ধ করেছেন লেঃ শমসের মবিন চৌধুরী। তিনি তার এক স্মৃতি কথায় বলেছেন-

“খুব সম্ভবতঃ দিন টি ছিল ১৯৭১ সালের ৭ ই এপ্রিল, কালুরঘাট ব্রীজের পাশে আমরা অবস্থান নেই। পাক আর্মি খবর পেয়ে যায় মেজর জিয়া তার বাহিনীর সাথে আছেন। যুদ্ধ কালীন পুরা সময়টি পাক আর্মির কাছে এক নাম্বার টার্গেট ছিল মেজর জিয়াউর রহমান। পারলে আটক করা অথবা হত্যা করা। তারা ভুলেনি কে রেডিওতে পুরা পাক বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। পাক আর্মি তার সমস্ত শক্তি এক করে কালুরঘাট ব্রীজ এলাকায় শেল বর্ষন শুরু করে, সাথে গুলি তো আছেই, সেদিন ওই এলাকায় আকাশের বৃষ্টির ফোটার মত পাকিস্তানী শেল বর্ষিত হচ্ছিল। সামনে, পেছনে, ডানে, বায়ে সব দিকে গুলি। আমি জিয়াউর রহমানকে বললাম, “স্যার আপনি কোন বাংকারে চলে যান।” তখন তিনি আমার দিকে ফিরে বললেন, “ If a bullet has my name written on it, it will find me whenever. I will not to inside any Bunker. That will discourage my troops, we must led by example, not Just by command (মহান আল্লাহতায়ালা যদি আমার নাম কোন বুলেটে লিখে থাকে আমি যেখানেই যাই না কেন সেটা আমাকে খুজে নেবে। আমি কোন বাঙ্কারে যাব না, আমার সৈন্যদের মনোবল ভেঙ্গে যাবে, হুকুম দেয়ার সাথে সেই কাজ আমাদের করেও দেখাতে হবে সামনে থেকে)”

১১ ই এপ্রিল এক সম্মুখ যুদ্ধে আহত হয়ে পাকিস্তান আর্মির কাছে বন্দী হন লেঃ শমসের। যুদ্ধবন্দী হিসাবে স্বাধীনতার পর তিনি মুক্তি পান। ২৫শে মার্চ বিদ্রোহ ঘোষনার পর তার ৩০০ যোদ্ধা নিয়ে চিটাগাং ত্যাগ করে কালুরঘাটের উদ্দ্যেশ্য রওনা দেন, সেদিন তার বাসার পাশ দিয়ে এই বাহিনী চুপিসারে বের হয়ে যায়। শমসের মোবিন সাহেব তাকে জিজ্ঞাস করেন, স্যার বাসায় তো ভাবী আছে এক মিনিটের জন্য হলেও দেখা করতে পারেন। জিয়াউর রহমান চলতে চলতেই উত্তর দেন, “তাহলে বাকী এ ৩০০ সৈন্যর পরিবারের কি হবে? সামনের দিকে এগিয়ে চল, তাদের আল্লাহ দেখবেন”

(সংকলিত)

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here