সিটি নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সমঝোতা!

নঈম নিজাম

ঢাকা সিটির নির্বাচন ও মনোনয়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর মানুষ হতাশ হয়েছে। বিস্মিত করেছে আমাকেও। আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিল ব্যবসায়ী আতিকুল ইসলামকে। বিএনপির প্রার্থী আরেক ব্যবসায়ী তাবিথ আউয়াল। এ দুই প্রার্থীকে আমি ভালো জানি। পছন্দও করি ব্যক্তিগতভাবে। দুজনের পরিবারকেও ভালো জানি। বিএনপির প্রার্থী তাবিথ ভালো পরিবারের সন্তান। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা তাদের নিকটাত্মীয়। আতিকুল ইসলাম একজন সজ্জন ব্যবসায়ী। তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য রয়েছে। তার সঙ্গে আমার অনেক দিনের সম্পর্ক।

আমাদের প্রধান দুটি দল আমার প্রিয় দুজন ব্যবসায়ীকে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। কারণ তাদের দলে কোনো সজ্জন রাজনীতিবিদ নেই যাকে তারা মনোনয়ন দিতে পারেন। অনেক সমালোচক বিএনপি ও আওয়ামী লীগের এই অবস্থানকে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব বলছেন। আমি তা বলব না। কারণ আমার মূল্যায়ন আলাদা। অনেক দিন থেকে রাজনীতির পরিবর্তন দেখছি। মাঝে মাঝে মনে হয়, রাজনীতিটা কোথায় যেন চলে যাচ্ছে। এই চলে যাওয়া নিয়ে সামাজিক গণমাধ্যমেও সমালোচনা হচ্ছে। ঢাকা সিটির ভোট বন্ধ ও দুই দলের অবস্থান নিয়ে কুমিল্লার সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মাহবুব রাজীবের একটা স্ট্যাটাস আমার চোখে পড়েছে। ফেসবুকে রাজীব লিখেছে— ‘অরাজনৈতিক টাকাওয়ালা ব্যক্তিদের নমিনেশন দিয়ে তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনীতিবিদদের অপমানিত করার অধিকার দুই বড় দলের কেউই রাখে না। একদিকে রাজনীতিতে পারিবারিক জমিদারি সিস্টেমের পরিবেশ আর অন্যদিকে দুর্নীতিবাজ টাকাওয়ালাদের নমিনেশন দেওয়া এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। আর মাঠের কর্মীরা এখন উড়ে এসে জুড়ে বসা নেতাদের কাছে প্রজা বা চাকরসম।’

ঢাকা সিটিতে একটা সময় ছিল যখন দুটি দলের নেতার অভাব ছিল না। প্রতিযোগিতা ছিল। মেয়র পদ নিয়ে লড়াই ছিল। কাউন্সিলর পদ নিয়ে মাঠের কর্মীদের প্রতিযোগিতা ছিল। এখন সবকিছুতেই পরিবর্তনের ঢেউ। কেউ কেউ বলছেন, ঢাকা সিটিকে ভাগ করার প্রয়োজন ছিল না। ভাগ করার কারণেই দলীয় নেতার অভাব পড়ছে। ঢাকা এক থাকলে কোনোমতে একজন প্রার্থী পাওয়া যেত। দুই ভাগ করার কারণে এখন নেতার সংকট চলছে। তার পরও বিএনপিতে আসাদুজ্জামান রিপন, মেজর আখতারুজ্জামান (অব.), কাইউমসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। আওয়ামী লীগে প্রথম দিকে অনেকে আগ্রহী থাকলেও পরে আর তা দেখা যায়নি। বরং অচেনা মুখের সমাহার ছিল বেশি। যা চোখে লেগেছে। এই আওয়ামী লীগ দেখতে তার সমর্থকরা অভ্যস্ত নয়। কারণ প্রার্থীর অভাব অন্য দলের হতে পারে, আওয়ামী লীগের নয়। আওয়ামী লীগে ক্লিন ইমেজের মানুষেরও অভাব নেই। তবুও কেন এমন হলো আমার কাছে স্পষ্ট নয়। হয়তো ভোট হবে না বুঝেই অথবা মনোনয়ন চূড়ান্ত জেনে আর কেউ আবেদন করেননি। অযথা প্রতিযোগিতা করতে চাননি। কারণ অকারণে প্রতিযোগিতা করে লাভ কী? তার চেয়ে সবকিছু জেনে-বুঝে না বোঝাটাই ভালো। মেয়র হানিফের বিষয়টিও একসময় দলে চমক ছিল। তবে তা এবারের মতো নয়। এবারের চমকটা আওয়ামী লীগারদের জন্য ভালোই ধাক্কা ছিল। কারণ অনেকে প্রস্তুত ছিলেন না। এভাবে মনোনয়ন অতীতে বিএনপি, জাতীয় পার্টিতে হতো। এখন আওয়ামী লীগে হচ্ছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন সংস্কৃতি।

আমার মনে আছে, ভোরের কাগজে কাজ করি। আওয়ামী লীগ তখন বিরোধী দলে। বিএনপি ক্ষমতায়। ঢাকা সিটি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হলো। বিএনপির ছিল দুই প্রার্থী। মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকা। দুজনই তখন মন্ত্রী। এর মাঝে মনোনয়ন পান মির্জা আব্বাস। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের লাইম লাইটের প্রার্থী মোজাফফর হোসেন পল্টু। হঠাৎ খবর পেলাম আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ভিন্ন চিন্তা করছেন। জেনেও গেলাম মনোনয়ন পাচ্ছেন মোহাম্মদ হানিফ। তিনি অনেক দিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির বাইরে। বঙ্গবন্ধুর লড়াকু সৈনিককে ঢাকার আঞ্চলিকতার কথা ভেবে মনোনয়ন দেবেন শেখ হাসিনা। মোজাফফর হোসেন পল্টুর মন খারাপ। কিন্তু করার কিছু ছিল না। তিনি ’৯১ সালের এমপি নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন। এ কারণে রাজনীতি থেকে আড়ালে মাঠের খেলোয়াড় হানিফকেই নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হয়। বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা থাকতেন ২৯ মিন্টো রোডে। খবরটা সেখান থেকেই পেয়েছিলাম। খবর পেয়ে গিয়েছিলাম মোহাম্মদ হানিফের পুরান ঢাকার বাড়িতে। হানিফ অন্য উচ্চতার একজন মানুষ ছিলেন। মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন। আমার সঙ্গে অনেক কথা হয়। পুরান ঢাকার মানুষ তাকে পছন্দ করত। একই সঙ্গে তিনি নতুন ঢাকার মানুষের মন জয় করে নেন। শেখ হাসিনার মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে চমক সৃষ্টি করেছিলেন হানিফ।

মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর একবার গিয়েছিলেন লন্ডনে। আমিও লন্ডনে। আড্ডার আসরে প্রাণবন্ত অন্য এক হানিফ। বঙ্গবন্ধুর প্রেস সেক্রেটারি আমিনুল হক বাদশাসহ জমে ওঠে টেমসের তীর। হঠাৎ তিনি বাদশা ভাইকে বললেন, আতাউর রহমান খান কোথায়? তার সঙ্গে দেখা করব। আমি বললাম আতা খান আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েছেন। এখন চলছে সামছুদ্দিন খানের যুগ। আপনি কি যাবেন? গেলে দল কি ভালোভাবে নেবে? জবাবে তিনি বললেন, আমি যাব পুরনো বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তিনি আওয়ামী লীগের পদে আছেন কি নেই আমার কী যায় আসে। এসব চিন্তা করে হানিফ রাজনীতি করে না। চলেন আমার সঙ্গে। কিশোরগঞ্জের শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল ছিলেন হানিফ ভাইয়ের সঙ্গে। ইকবাল চলে গেলেন আমাদের রেখে। আমরা গেলাম আতা খানের রেস্টুরেন্টে। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের এই দুঃসময়ের নেতা সময়ের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে আওয়ামী লীগ থেকে তখন আউট। তার সঙ্গে আমারও গভীর সম্পর্ক ছিল। তার বাড়িতে একবার ছিলামও। তার স্ত্রী একজন ব্রিটিশ নারী। কিন্তু অনেক আন্তরিক। আতা খানের রেস্টুরেন্টে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন মিয়া আখতার হুসেন সানু। সেই আড্ডার কথা এখনো মনে পড়ে। পুরনো দিনের ছবিগুলো আমার কাছে রয়েছে। হানিফ ভাই, বাদশা ভাই আজ কেউ নেই। পাশাপাশি সানুও চলে গেলেন। ভিন্ন চিন্তার মানুষ মনে হয় বেশি দিন থাকেন না। তারা ধূমকেতুর মতো হঠাৎ চলে যান কাউকে কিছু না জানিয়ে। মোহাম্মদ হানিফ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কাজ করতেন। পরে বঙ্গবন্ধু তাকে এমপি ও হুইপ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা তাকে বানিয়েছিলেন মেয়র। শেষ দিকে তার ধর্মচিন্তা নিয়ে অনেকে নানারকম কথা বলেছিলেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরিরও চেষ্টা ছিল কারও কারও। কিন্তু হানিফ তার অবস্থান থেকে কখনো সরেননি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সময় মানবঢাল তৈরি করে জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে প্রিয় নেত্রীকে রক্ষা করে প্রমাণ করেছিলেন হানিফ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর বিপক্ষে ছিলেন না। এমনি করে বঙ্গবন্ধুকে প্রমাণ দিয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদও। তবে বঙ্গবন্ধু জানতে পারলেন না, যারা তাকে হত্যা করেছিল তারাই খুন করেছিল তাজউদ্দীন আহমদসহ চার নেতাকে।

এবারকার নির্বাচন দেখে হানিফ ভাইয়ের কথা আবার মনে পড়ল। নির্বাচন স্থগিত হবে এমন গুজব আগে থেকেই ছিল। জানাজানিও ছিল আদালতে মামলা হবে। আর মামলা হলে স্থগিতের সম্ভাবনাই বেশি। মামলা ঠিকই হয়। ভাটারা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামলা করেন। তার আইনজীবী ছিলেন আওয়ামী লীগের প্যানেল নেতা। আওয়ামী লীগের এক নেতাও মামলা করেছিলেন। বিএনপি নেতার মামলায় স্থগিত হয় ঢাকা সিটির ভোট। বড় অদ্ভুত আমাদের রাজনীতি। বড় অদ্ভুত রাজনীতির মেরুকরণ ও নানামুুখী সমঝোতা। গোপন সম্পর্ক। এখানে সাধারণ মানুষ গিনিপিগ। মানুষকে নিয়েই চলে রাজনীতিবিদদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বিএনপির একজন নেতা মামলা করেন, তার দল এ নিয়ে আবার সমালোচনাও করে। হাস্যকর কার্যক্রমের একটা সীমা থাকা উচিত। আমার জানা মতে, বিএনপি এখনো তাদের সেই নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করেনি। তার মানে কী? আজব সবকিছু! আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভিতর থেকে এমন অনেক নাটক হবে। যে নাটকের পরিচালকরা হয়তো বসে আছেন। কিন্তু দর্শকরা জানেন না তাদের সামনে কী চিত্রনাট্য আসবে। রাজনীতির রংমহলে কত কিছুই দেখছি। কত কিছুই দেখব।

রাজনীতির নানামুখী কাণ্ড নিয়ে এখন কেউ আর কথা বলেন না। বলে লাভও নেই। এখানে অপমানের জবাব দেওয়া যায় না। দিলে সোহেল তাজ হয়ে বিদায় নিতে হয়। সাবের হোসেন চৌধুরীর মতো চুপচাপ হয়ে যেতে হয়। সুলতান মনসুরের মতো রক্তক্ষরণ নিয়ে থাকতে হয়। মান্নার মতো কারাগারে যেতে হয়। শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপিতে প্রতিবাদীদের অবস্থান আরও নিষ্ঠুর। এই কারণে দুই পার্টিতে এখন আর কেউ কথা বলেন না। নীরবে সবাই মুখ বুজে মেনে নেন। অফ দ্য রেকর্ডে মিডিয়ার সামনে কথা বলেন। অন রেকর্ডের সাহস নেই। সবচেয়ে বড় বিষয় এখনকার রাজনীতি আর নেতা তৈরি করে না। গণতান্ত্রিক সরকারগুলো ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে নারাজ। ’৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নাম নেয়নি। তার পর থেকে হারিয়ে গেছে ছাত্র সংসদ।
এবার সিটি নির্বাচন ঘিরে ছাত্রলীগ ব্যাকগ্রাউন্ডের নতুন কেউ তৈরি হতে পারত আওয়ামী লীগে। দল সেই সুযোগটুকু তৈরি করল না। রাজনীতিতে দরকার এখন কিছু কর্মচারী, নেতা নন। ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে নতুন নেতা তৈরি হতে পারত। কিন্তু কে শুনবে কার কথা। আমাদের অনেক কিছুই ভাবতে হবে। এখন মাঠ পর্যায়ে এমপি সাহেবরা কর্মী তৈরি করেন না। একটা পর্যায়ে গিয়ে সাহস, ভালো ইমেজের কর্মীদের থামিয়ে দেন তারা। ভয়, ভালো ইমেজের কর্মীরা যদি প্রতিপক্ষ হয়। তাই এমপিরা রাজনীতিতে নিয়ে আসেন নিজের স্ত্রী, পুত্র, কন্যাকে। তাদের বিভিন্ন পদ দেন। সেদিন একজন সরকারি কর্মকর্তা বললেন, ঢাকার পাশের একটি এলাকায় বাবা দেন এক নির্দেশ, পুত্রের আরেক, আর পুত্রের মা বলেন অন্য কথা। তিনজনই এই আসনে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বিভ্রান্ত হন। কিন্তু বলার কিছু নেই। কারণ তিনজনই পদপদবিতে আছেন। কর্মীরা মাঝে মাঝে হতাশ হন। বিরক্ত হন। ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বেলা শেষে তাদের যাওয়ার জায়গা নেই। তাই তাদের করার কিছু নেই। রাজনীতিকদের আপন নেই, পর নেই, ভাই নেই, বন্ধু নেই, কর্মী নেই। ক্ষমতাই সব। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য অথবা থাকার জন্য যা দরকার তাই করেন সবাই। সমস্যা এখানেই। অন্য কিছু নয়।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here