রাজনীতিতে কি বিশেষ কিছু ঘটতে যাচ্ছে?

বিভুরঞ্জন সরকার

ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখের পর দেশের রাজনীতিতে কি বিশেষ কোনও কিছু ঘটার সম্ভাবনা অথবা আশঙ্কা দেখা দেবে? নাকি হুমকি-হুশিয়ারি আর কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই অধ্যায়ের। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় হওয়ার কথা আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি। ধারণা করা হচ্ছে, এই মামলায় বেগম জিয়া দণ্ডিত হবেন এবং তাকে কারাগারেও নেওয়া হতে পারে। যদিও বেগম জিয়া দলের শীর্ষ নেতাদের বলেছেন, তাকে গ্রেফতারের মতো ভুল শেখ হাসিনা করবেন না। আদালত কী রায় দেবেন তা আমাদের জানা নেই। অনুমানের ওপর ভর করে চলছে রাজনৈতিক মহলে তোড়জোড়। বিএনপি যেমন নানামুখী প্রস্তুতি নিচ্ছে, তেমনি সরকার এবং সরকারি দলও বসে নেই। বেগম জিয়ার শাস্তি হলে দল হিসেবে বিএনপির প্রতিক্রিয়া দেখানো স্বাভাবিক। দলীয় প্রধানের শাস্তি হলে দল নিশ্চুপ বা নিষ্ক্রিয় থাকলে সেটা হবে দলের জন্য আত্মহত্যার শামিল। আবার বিএনপি যদি সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামে এবং হঠকারিতার পথে যায় তাহলে সরকারও বসে থাকবে না। সে ক্ষেত্রে মুখোমুখি অবস্থানের পরিণতি শান্তিপূর্ণ হবে কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। দেখতে হবে বিএনপি কী করে এবং কতদূর যেতে চায়।

আমরা যদি ধরে নেই যে আদালত বেগম জিয়াকে অপরাধী সাব্যস্ত করে দণ্ড দিলেন, তাহলে বিএনপি কী করবে? শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশের মাধ্যমে নিন্দা-প্রতিবাদ জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সরকারের সঙ্গে শেষ বোঝাপড়ায় নেমে পড়বে? বিএনপির মধ্যে এসব প্রশ্নে মতভিন্নতা আছে বলে শোনা যায়। একপক্ষ মনে করে এই ইস্যুতে অহেতুক শক্তিক্ষয়ের পথে না গিয়ে জনমত পক্ষে আনার জন্য প্রচারমূলক কর্মসূচিতে থাকা ভালো। জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয় এমন কর্মসূচি থেকে বিরত থাকলে বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি বাড়বে। আগামী নির্বাচনে সেটা বিএনপির বড় পুঁজি হবে।

বিএনপির আরেক অংশ মনে করে, সরকারের সঙ্গে নমনীয় আচরণ করলে সরকার পেয়ে বসবে। এমনিতেই সরকার বিএনপিকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে। সরকার চায় না আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করুক। বিএনপি নির্বাচনে গেলে সরকার চাপে থাকবে আর না গেলে অনায়াসে বিজয় হবে। সেজন্যই রাজনৈতিক ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দুর্নীতির মামলায় শাস্তি দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে চায়। সরকারের এই পরিকল্পনা রুখতে হলে বিএনপিকে শক্তির পরিচয় দিতে হবে। সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে। এই মামলার রায়কে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু করার পক্ষে তাই বিএনপির কট্টরপন্থীদের অবস্থান।

গত কয়েক দিন ধরে বিএনপি একের পর এক বৈঠক করছে। করণীয় নির্ধারণ করতে শলাপরামর্শ করছে। দলীয় পর্যায়ে করছে। জোটগতভাবেও করছে। বিদেশি কূটনৈতিকদের সঙ্গেও বৈঠক করেছে। এগুলো ভালো লক্ষণ। ভালো-খারাপ যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক না কেন সেটা কারো একার মস্তিষ্কজাত না হওয়াই শ্রেয়। তবে লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে বিএনপিতে টাফ লাইনে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। বিএনপি হয়তো উস্কানিমূলক কার্যকলাপ করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায়।

প্রশ্ন হলো, সরকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বা সংঘর্ষে জড়িয়ে এখনই বিএনপি খুব ফায়দা হাসিল করতে পারবে কি? বাস্তবতা কিন্তু বলে না যে শক্তি পরীক্ষায় বিএনপি জয়যুক্ত হতে পারবে। সরকার একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার করবে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগও দলগতভাবে মাঠ দখলে রাখতে চাইবে। ৩০ জানুয়ারি প্রিজন ভ্যানে হামলা করে বিএনপি কর্মীরা তাদের দুই কর্মীকে ছিনিয়ে নিয়েছে। একজন অতিরিক্ত উপকমিশনারসহ চারজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে। এই ঘটনার পর পুলিশি অ্যাকশন শুরু হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে বিএনপির ৬৯ জন কর্মী-সমর্থককে গ্রেফতার করা হয়েছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং আরেক সিনিয়র নেতা তরিকুল ইসলামের পুত্র অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে ৩০ জানুয়ারি রাতেই আটক করা হয়েছে। অনেকের বাড়িতেই রাতে পুলিশ হানা দিয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, সরকার অলরেডি কঠোর অবস্থানে গেছে। বিএনপি নেতারা গ্রেফতার আতঙ্ক কাটিয়ে এখন কতটুকু কী করতে পারবে বলা মুশকিল। এ বিষয়ে তাদের অতীত রেকর্ড উজ্জ্বল নয়। বিএনপির উচিত ছিল ৮ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করা। ৩০ জানুয়ারির হঠকারিতা সরকারকে তাদের বিরুদ্ধে আগাম অ্যাকশনের সুযোগ করে দিল।

বিএনপি যেমন মনে করছে ঘটনা সেরকম ঘটবে না। বিএনপির ধারণা, দেশের মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপে আছে। বিএনপি ডাক দিলেই তারা মাঠে নেমে আসবে। তাছাড়া খালেদা জিয়া যেহেতু একজন জনপ্রিয় নেত্রী সেহেতু তাকে দণ্ড দেওয়া হলে আগুনে ঘি ঢালা হবে। মানুষ খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বে। মানুষের সুনামিতে নাকি সরকারের পতন ঘটবে। জনমনস্তত্ত্ব সম্পর্কে বিএনপির ধারণা অতীতে সঠিক প্রমাণিত হয়নি। এবারও না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। দেশের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীর বিএনপির প্রতি সমর্থন আছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তারা কোনও হিসাব-নিকাশ ছাড়াই বিএনপিকে ভোটও দেয়। কিন্তু বিএনপির কোনও আন্দোলনে শরিক হয় না।

সরকারকে বুঝতে হবে যে মাত্রাতিরিক্ত দমন-পীড়ন মানুষকে পীড়িতদের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তোলে। শক্তির জোরে জয়ী হওয়া যায় সাময়িকভাবে। স্থায়ী জয় যুক্তির জোরেই। সরকারকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। আর বিএনপি অংশ না নিলে সে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ও প্রশ্ন থাকবেই। বিএনপি ভীতি কাটিয়ে ওঠার রাজনৈতিক স্থায়ী উপায় সরকারকে খুঁজতে হবে। চাপে ফেলে বা কূটকৌশলে বিএনপিতে ভাঙন ধরিয়ে কোনও ভালো ফল আখেরে পাওয়া যাবে না। যারা দল ভাঙে তাদের আমাদের দেশের মানুষ পছন্দ বা সমর্থন করে না। অতীতে এর অনেক নজির আছে।

দিন তারিখ নিয়ে আমাদের দেশের রাজনীতিতে উত্তেজনা নতুন কোনও ঘটনা নয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আগে থেকে ঠিক করে দেওয়া তারিখে বিশেষ কিছু হয়নি। আন্দোলন তো নয়ই। আন্দোলন হয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে। কোনও নেতা বা দল সে তারিখ নির্ধারণ করতে পারেন না। ইতিহাসে কালেভদ্রে কালজয়ী কোনও নেতাও হয়তো রাজনীতির ইতিহাসে নতুন তারিখ উজ্জ্বল করে তোলেন। যেমন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ তারিখটিকে অনন্য করেছেন তার ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে।

৮ ফেরুয়ারিকে নিয়ে যত উত্তেজনাই ছড়ানো হোক না কেন সেটা ইতিহাস তৈরি করবে অথবা ওই দিন বা তার পরের কয়েকদিনের মধ্যে দেশের রাজনীতিতে বড় কোনও পরিবর্তন ঘটে যাবে বলে যারা মনে করছেন তাদের জন্য হয়তো হতাশাই অপেক্ষা করছে।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here