বিসিএসে আইন ভেঙে রাজনৈতিক পরিচয় খুঁজছেন গোয়েন্দারা

বরাবরের মতো ৩৬তম বিসিএসের গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরিতেও আইন ভেঙে খোঁজা হচ্ছে রাজনৈতিক পরিচয়। এতে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যে কোনো ধরনের সংশিস্নষ্টতা থাকা উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নিয়োগ বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া প্রার্থীর পাশাপাশি তাদের বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক পরিচয় খুঁজতে গিয়ে তদন্ত্ম কার্যক্রমও বিলম্বিত হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশিস্নষ্ট কর্মকর্তারা।

জানা যায়, বিসিএস নিয়োগ বিধিমালা ১৯৮১ অনুযায়ী প্রার্থীর পিতা-মাতা বা পরিবারের কোনো সদস্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলে প্রার্থীকে নিয়োগ বঞ্চিত করার কোনো বিধান নেই। কারণ, সরকারি চাকরিতে যোগদানের জন্য গোয়েন্দা প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য হলো- চাকরিপ্রার্থী রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত কিনা সেটা যাচাই করা। অথচ প্রার্থী বা তার পরিবারের সদস্যরা সরকার সমর্থক না হলেই তিনি রাষ্ট্রবিরোধী কাজের সঙ্গে জড়িত বলে ধরে নিচ্ছে তদন্ত্মকারী সংস্থাগুলো। প্রতিবেদনে তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্ত্মব্য করা হচ্ছে।

এই মন্ত্মব্যের কারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও দেশের সবচেয়ে কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অত্যন্ত্ম সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়া প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে পারছে না। এতে গত ৯ বছরে তিন শতাধিক প্রার্থী নিয়োগ বঞ্চিত হয়েছেন। তারা বছরের পর বছর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ঘুরলেও ভাগ্যের চাকা ঘুরছে না।

এদিকে অতীতের মতো ৩৬তম বিসিএসেও শুরম্ন হয়েছে তদন্ত্ম কার্যক্রম। ফলে সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও ৩৬তম বিসিএসের ২ হাজার ৩২৩ প্রার্থী চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্ত্মায় ভুগছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদিন মালিক যায়যায়াদিনকে বলেন, সরকারি চাকরিতে যোগদানের জন্য তদন্ত্মের মূল উদ্দেশ্য হলো- চাকরি প্রার্থী রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত কিনা সেটা যাচাই করা। কিন্তু কোনো প্রার্থী বা তার পরিবার সরকার সমর্থক না হলেই ধরে নেয়া হয় তিনি রাষ্ট্রবিরোধী কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, এটা অন্যায় ও আইনবহির্ভূত। কোনো গোয়েন্দা সংস্থা এমন কাজ করতে পারে না।

ড. শাহদিন মালিকের ভাষ্য, দেশে খুব অল্প বিষয়ই আইন অনুযায়ী হয়। তাই এসব গা সওয়া হয়ে গেছে। তবে সংশিস্নষ্ট প্রার্থী এজন্য আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। আদালাত তাদের অভিযোগ যাচাইয়ের পর স্বপদে নিয়োগের জন্য নির্দেশ দিতে পারেন। আদালতে যাওয়া ছাড়া নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীদের বিকল্প কোনো পথ নেই।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ অক্টোবরে ৩৬তম বিসিএসের চূড়ান্ত্ম ফল প্রকাশ করে পিএসসি। এরপর উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নিয়োগ দেয়ার জন্য গত ৯ নভেম্বর পিএসসি সুপারিশ পাঠায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। জনপ্রশাসনের সিদ্ধান্ত্ম অনুযায়ী ৩৬তম বিসিএসের তদন্ত্ম করবে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও জেলা প্রশাসন। এজন্য গত ২১ ডিসেম্বর প্রাক চাকরি বৃত্তান্ত্ম যাচাই ফরম জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এসবিতে পাঠানো হয়। আর সংশিস্নষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয় গত ১০ জানুয়ারি। সংস্থাগুলো প্রার্থীদের তথ্য পাওয়ার পর তদন্ত্ম কার্যক্রমও শুরম্ন করেছে।

এর আগে গত ৩৫তম বিসিএসে সরকারের দুটি গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে উত্তীর্ণ প্রার্থীর তথ্য অনুসন্ধান করা হয়। একই প্রার্থী সম্পর্কে দুই গোয়েন্দা সংস্থা দুই ধরনের তথ্য দেয়ার কারণে আরও বেশি জটিলতার সৃষ্টি হয়। তাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত্ম নেয়, পরবর্তীতে একটি গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তথ্য যাচাই-বাছাই করা হবে। পাশাপাশি সংশিস্নষ্ট জেলা প্রশাসনও উত্তীর্ণদের তথ্য যাচাই করবে। সে অনুযায়ী ৩৬তম বিসিএসে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও সংশিস্নষ্ট জেলা প্রশাসন প্রার্থীদের তথ্য যাচাই-বাছাই করছে। তবে ৩৫তম বিসিএসে ৮১ জন প্রার্থীকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ বঞ্চিত করা হয়। এসব প্রার্থীকে পুনঃতদন্ত্ম করেও নিয়োগ দেয়া হয়নি।

এছাড়া তদন্ত্মের জন্য প্রার্থীদের প্রাক চাকরি বৃত্তান্ত্ম যাচাই ফরম জনপ্রশাসন থেকে পাঠানোর সময় একমাসের মধ্যে তদন্ত্ম কার্যক্রম শেষ করার কথা বলা হলেও ৬ মাসেও তা শেষ করে না তদন্ত্ম সংস্থাগুলো। ফলে চূড়ান্ত্ম ফল প্রকাশের পর চাকরিতে যোগদান করতে প্রায় এক বছর লেগে যায়। ৩৫তম বিসিএসে চূড়ান্ত্ম ফল প্রকাশের পর নিয়োগের গেজেট হয় ৮ মাস পর। আর ৩৪তম বিসিএসের গেজেট হতে সময় লাগে প্রায় এক বছর।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) পুলিশ সুপার (ভিআর-পিপি) ফরিদা ইয়াসমিন যায়যায়দিনকে বলেন, জনবল সংকটের কারণে তদন্ত্ম কার্যক্রমে কিছুটা বিলম্বিত হয়। তবে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন যাতে দ্রম্নত তদন্ত্ম শেষ করা যায়। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশিস্নষ্ট প্রার্থী কিংবা তার আত্মীয়স্বজনের সংশিস্নষ্টতার কারণে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নেতিবাচক মন্ত্মব্য করার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, এ বিষয়ে জানতে হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তবে ৩৬তম বিসিএসের তদন্ত্ম কার্যক্রম শুরম্ন হয়ে গেছে। ভালোভাবে তদন্ত্ম করা হচ্ছে। আশা করেন ৩৬তম বিসিএসের সবাই চাকরিতে যোগদান করতে পারবেন।

তদন্ত্ম কার্যক্রম সম্পর্কে রংপুর জেলার জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান যায়যায়দিনকে বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয় সেভাবেই তারা কাজ করেন। এর বাইরে কিছুই হয় না। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নেতিবাচক মন্ত্মব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে জানতে হলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে একাধিক জেলা প্রশাসক যায়যায়দিনকে বলেন, চাকরি প্রার্থীদের গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাঠানোর বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা রয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিবেদন পাঠানো হয়। জনপ্রশাসনের নির্দেশনায় রাজনৈতিক পরিচয়কে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। কারণ, প্রার্থীদের প্রাক চাকরি বৃত্তান্ত্ম যাচাই ফরমের সঙ্গে জনপ্রশাসনের নিজস্ব আরও একটি ফরম রয়েছে। এতে প্রার্থী রাষ্ট্রবিরোধী বা রাজনৈতিক কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত কিনা তার বিবরণ এবং প্রার্থীর পিতা-মাতা ও পরিবারের কোনো সদস্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত আছেন কিনা তার বিবরণ লিখতে হয়। এসব বিষয় বিবেচনা করে মন্ত্মব্য করলে রাজনৈতিক পরিচয়টাই বেশি গুরম্নত্ব পায়।

বিসিএস নিয়োগ বিধিমালা ১৯৮১ এর ৩(বি) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো পদে সরাসরি নিয়োগ হবে না, যদি বাছাইকৃত ব্যক্তির পূর্ব কার্যকলাপ যথাযোগ্য এজেন্সির মাধ্যমে তদন্ত্ম না হয়ে থাকে এবং তদন্ত্মের ফলে দেখা না যায় যে, প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে নিযুক্তির জন্য তিনি অনুপযুক্ত নন।’ এজন্য প্রাক চাকরি বৃত্তান্ত্ম যাচাই ফরমের মাধ্যমে প্রার্থীর সব বিষয় তদন্ত্ম করা হয়। কিন্তু প্রাক চাকরি বৃত্তান্ত্ম যাচাই ফরমে প্রার্থী, প্রার্থীর পিতা-মাতা বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত আছেন কিনা তার বিবরণ জানতে চাওয়া না হলেও তদন্ত্মকারী সংস্থাগুলো এই পরিচয়কেই বেশি প্রাধান্য দেয়। এ জন্য আলাদা আরও একটি ফরম তৈরি করে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় লিপিবদ্ধ করা হয়। ফলে প্রার্থীর পিতা-মাতা বা তার দূর সম্পর্কের কোনো আত্মীয়স্বজন বিরোধী দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য পেলেই নিয়োগ বঞ্চিত করার মন্ত্মব্য করেন তদন্ত্ম সংস্থাগুলো। অনেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিছু ক্ষেত্রে সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের অভিযোগের কারণেও দেশের মেধাবী এই শিক্ষার্থীদের নিয়োগ বঞ্চিত করা হয়।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান যায়যায়দিনকে বলেন, ৩৬তম বিসিএসের তদন্ত্ম কার্যক্রম শুরম্ন হয়েছে। দ্রম্নত সব কাজ শেষ করে প্রার্থীদের নিয়োগ দেয়া হবে। অনেক সময় গোয়েন্দা প্রতিবেদন আসতে দেরি হওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। মোজাম্মেল হক খান বলেন, ‘এবার তারা দ্রম্নত কাজ শেষ করার জন্য বার্ষিক কর্ম সম্পাদন চুক্তিতে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়েছেন। এছাড়া এক মাসের মধ্যে তদন্ত্ম কার্যক্রম শেষ করার কথা বলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নিয়োগের সুপারিশ করে পিএসসি। প্রার্থীদের যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে প্রতিবেদন দেন গোয়েন্দারা। তার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত্ম নিয়োগ দেয়া হয়। সেখানে কারও বিরম্নদ্ধে আপত্তি থাকলে তাদের কিছুই করার থাকে না। তারপরও অনেক ক্ষেত্রে পুনঃতদন্ত্মে পাঠানো হয়। ইতিবাচক প্রতিবেদন পেলে নিয়োগ দেয়া হয়। এটি চলমান প্রক্রিয়া।

সরকারি কর্ম-কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক যায়যায়দিনকে বলেন, তারা চূড়ান্ত্ম ফল প্রকাশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠিয়ে দিয়েছে। এরপর আর তাদের কিছু করার থাকে না। বিভিন্ন ধরনের যাচাই-বাছাই শেষে গেজেট প্রকাশ করবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে।

প্রাক চাকরি বৃত্তান্ত্ম যাচাই ফরমে যে সব তথ্য চাওয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে প্রার্থীর পুরো নাম, জাতীয়তা, পিতার পুরো নাম ও সরকারি চাকুরিতে থাকলে পদের নাম ও জাতীয়তা, স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানা, প্রার্থী যেসব স্থানে বিগত পাঁচ বছরে ছয় মাসের অধিক অবস্থান করেছেন সেই সব স্থানের ঠিকানা, জন্ম তারিখ, প্রার্থী পনের বৎসর বয়স হতে যেসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করেছেন, পূর্বে চাকরি করে থাকলে তার বিবরণ ও ঠিকানা, মুক্তিযোদ্ধার পুত্র/কন্যা/পুত্র কন্যার পুত্র কন্যা কিনা, প্রতিবন্ধি কিনা, ফৌজদারী, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো মামলায় গ্রেফতার, অভিযুক্ত বা দন্ডিত এবং নজরবন্দী বা বহিষ্কৃত হয়েছেন কিনা, কেউ বিবাহিত বা অবিবাহিত কিনা তার বিবরণ।

সূত্র: যায়যায়দিন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here