প্রশাসনকে বিরোধী নেতাকর্মী ধরপাকড়ের নির্দেশ

উন্মুক্ত স্থানে সভা-সমাবেশে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা, মিছিলে বাধা এবং বিভিন্ন মামলায় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের হিড়িকে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে কোনঠাসা থাকলেও এবার আরও কঠোর হচ্ছে সরকার। সে লক্ষ্যে কৌশলী নানা ছক এঁটে মধ্য জানুয়ারি থেকে প্রশাসনকে সর্বোচ্চ তৎপরতা চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি চলতি সপ্তাহ থেকেই দেশব্যাপী ধরপাকড় অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।

প্রশাসনিক সূত্রগুলো জানায়, স্বল্প সময়ের মধ্যেই খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। আর তা তার বিরুদ্ধে যাওয়ার বিষয়টিও ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে আসছে। এমনটা হলে সরকারবিরোধী এ দলটি স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক উত্তাপ ছড়ানোর চেষ্টা করবে। ঘোষণা হতে পারে সরকারবিরোধী এক দফার কর্মসূচি। সর্বাত্মক কর্মসূচি ঘোষণা করে দলের নেতাকর্মীরা যে কোনো মূল্যে রাজপথে নামার চেষ্টা করবেন। এতে হামলা, ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতির ফাঁদে পড়তে পারে দেশ।

টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলো সংঘাত-সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ারও জোরালো আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়াও এর সঙ্গে আগামী জাতীয় একাদশ নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশের বিষয়টিও অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। তাই দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই সরকার আগেভাগেই হার্ডলাইনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে।

তবে সরকারের এ কৌশলী পরিকল্পনায় বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের অহেতুক হয়রানি-নির্যাতনের কোনো ছক নেই বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতনরা। তারা জানান, জঙ্গি দমন, মাদক নির্মূল, আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, সাম্প্রদায়িক শান্ত্মি বিনষ্টে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র বানচাল, রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে সৃষ্ট নৈরাজ্য ঠেকিয়ে নির্বাচনী লেভেল পেস্নয়িং ফিল্ড তৈরির লক্ষ্যে সরকার আগাম এ তৎপরতা চালাচ্ছে। এ অভিযানে সরকারি দলের ব্যানারে থাকা চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ভূমিদসু্য এবং অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ীরাও রেহাই পাবে না। এ ব্যাপারে মাঠ প্রশাসনকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হবে বলেও নিশ্চিত করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, গত নভেম্বরের মাঝামাঝিতে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত ছক তৈরি করা হলেও রংপুর পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে তা এতোদিন স্থগিত রাখা হয়। তবে সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট শেষ হওয়ায় এবার ‘অ্যাকশন পস্নান’ কার্যকরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নানাভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী অস্ত্রধারী পলিটিক্যাল ক্যাডারদেরও এ অভিযানের আওতায় ধরপাকড় করা হবে। বিশেষ করে নানা উস্কানিতে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার মিশনে নামা ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রকারীচক্র এবং এর নেপথ্য মদদদাতাদের বিরম্নদ্ধে কঠোর ‘অ্যাকশনে’ নামার ছক তৈরি করা হয়েছে।

পুলিশের এআইজি পদমর্যদার একজন কর্মকর্তা জানান, বিগত সময়ে বিভিন্ন সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনায় শুধু সরাসরি অংশগ্রহণকারীদের বিরম্নদ্ধে মামলা করা হলেও এখন থেকে এ ব্যাপারে আরও কঠোর হবে পুলিশ। এ ধরনের ঘটনা দ্রম্নত তদন্ত্ম করে এর নেপথ্য মদদদাতা ও হুকুমদাতাকেও আসামি করা হবে। এতে গোপন বৈঠক করে পলিটিক্যাল গডফাদারদের নাশকতা চালানোর অপতৎপরতা কমবে। বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকাতে গুলির নির্দেশও দেয়া হবে বলে জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।

এদিকে সরকারের হার্ডলাইনে নামার বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কারো কাছ থেকে সরাসরি কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও থানার ওসিরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ কর্মপরিকল্পনার নানা কৌশলের কথা জানিয়েছেন। মামলা ও ওয়ারেন্ট মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ানো রাজনৈতিক ক্যাডারদের গ্রেপ্তারে উপরমহলের জোরালো তাগিদের বিষয়টিও তারা স্বীকার করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিরপুর জোনের একটি থানার একজন ওসি (তদন্ত) যায়যায়দিনকে জানান, বিএনপি-জামায়াত ও শিবিরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সক্রিয় নেতাকর্মীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এরই মধ্যে তারা জোগাড় করেছেন। এদের কার বিরম্নদ্ধে কতটি মামলা রয়েছে, কোনো মামলায় আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে কিনা এবং কে কোথায় অবস্থান করছেন- সে তথ্যও তাদের হাতে রয়েছে। ক্যাটাগরিওয়াইজ নেতাদের তিনভাগে ভাগ করে সে তালিকা প্রতিটি থানার সাব-ইন্সপেক্টরদের মধ্যে বণ্টন করে তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের কোনো সক্রিয় নেতা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালি কারো ঘাড়ে ভর করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কিনা তা খুঁজে বের করারও নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্যাডারদের প্রশ্রয়দাতা পুলিশ কর্মকর্তাদেরও চিহ্নিত করা হবে। বিগত সময়ে বোমাবাজি, নাশকতা ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত কোনো ক্যাডারকে পুলিশ গ্রেপ্তার করার পর ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতা ছাড়িয়ে নেয়ার তদবির করলে তাকেও আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সংশিস্নষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এ মিশন সফল করতে থানা পুলিশের সঙ্গে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) ও ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)সহ গোয়েন্দা সংস্থা সার্বিক কার্যক্রম সমন্বয় করবে। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে রিজার্ভ ফোর্সের সহায়তাও নেয়া হবে। এরই মধ্যে এ প্রস্তুতি চূড়ান্ত্ম করে প্রতিটি থানায় দুই বা ততোধিক বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতি টিমে একজন পরিদর্শক, দুইজন সাব-ইন্সপেক্টর ও চারজন কনস্টেবল রয়েছে।

ডিএমপির একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতার সঙ্গেই বিরোধী শিবিরের গোপন আঁতাত রয়েছে। এদের কেউ কেউ গোপন ও প্রকাশ্যে একসঙ্গে একাধিক ব্যবসা চালাচ্ছেন। এমনকি তারা মিলেমিশে টেন্ডারবাজি, ভূমি দখল ও চাঁদাবাজি করছেন। এ তালিকা তৈরির কাজও পুলিশ শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এ সব ‘ডুয়েল প্লেয়ারদেরও’ কঠোর নজরদারিতে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এদিকে সরকার আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে হার্ডলাইনে নামার কথা বললেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এতে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাদের ভাষ্য, একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরেই আবর্তিত হবে চলতি বছরের রাজনীতি। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার বিরম্নদ্ধে চলমান দুর্নীতি মামলার রায় সবচেয়ে বড় ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হতে পারে। কেন না এই রায়ের পরই স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে, আগামী দিনের রাজনীতি কোনো দিকে মোড় নেবে। এ মামলার রায় বিএনপি চেয়ারপারসনের বিপক্ষে গেলে যেমন রাজপথ উত্তপ্ত হতে পারে, তেমনি পক্ষে গেলে দলের নেতাকর্মীরা নতুনভাবে চাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনী যুদ্ধের প্রস্তুতিতে জোরেশোরে মাঠে নামবে বিএনপি। তাই দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী ও জঙ্গি দমন এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে সরকার মূলত প্রশাসনকে দিয়ে বিরোধী দলকে কোনঠাসা করে রাখতে চাইছে।

তবে এসব কৌশলিী পরিকল্পনা বাস্ত্মবায়নের চেষ্টা চালিয়ে সরকার তার মূল টার্গেটে আদৌও পৌঁছাতে পারবে কিনা তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশেস্নষকদের যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। তাদের মতে, গত দু’বছর ধরে বিএনপি অনেকটা ইতিবাচক রাজনীতি করছে। এমনকি ছোট-বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে নানাভাবে সরকারের রোষানলে পড়লেও তা সয়ে নিচ্ছে। সংঘাত বা সহিংসতা এড়িয়ে তারা সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির দিকে গুরম্নত্ব দিচ্ছে। সর্বশেষ ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালনের লক্ষ্যে বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার অনুমতি চেয়ে প্রত্যাখিত হলেও এর প্রতিবাদে কঠোর কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করেনি। এর আগে রোহিঙ্গা শিবিরে ত্রাণ দিতে আসা-যাওয়ার পথে খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলা ও নানাভাবে প্রতিবন্ধকতার ঘটনাতেও বিএনপি নীরব ভূমিকা পালন করেছে। এতে দলটি পরোক্ষভাবে লাভবানই হয়েছে। ঠিক একইভাবে নির্বাচনী বছরের শুরুতে বিরোধী দলকে চাপে রাখতে সরকার হার্ডলাইনে নামলে এ কৌশল ক্ষমতাসীনদের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

তাদের ভাষ্য, বিএনপিকে ছাড়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচন আজও সরকারের জন্য দেশ-বিদেশে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে। সে জন্য বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের বিশেষ নজর থাকবে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর যত কৌশলেই নির্যাতনের খড়গ নামানো হোক না কেন তাতে সরকারের ইমেজ ক্ষুণ্ন্ন হবে। যার নেতিবাচক প্রভাবে আগামীর নির্বাচনের মাঠে পড়বে।

তবে সরকার যেভাবে হার্ডলাইনে নামতে চাইছে তাতে সে চাপ সামাল দিয়ে বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা আদৌ রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। তাদের ধারণা, সরকারবিরোধী রাজনীতিকদের কঠোর চাপে রাখা হলে অনেকেই এ অঙ্গন থেকে সরে দাঁড়াবে। বিশেষ করে অস্ত্রধারী ক্যাডাররা গা ঢাকা দেবে। এতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক অঙ্গনে এককভাবে দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ পাবে। তবে এতে আইন শৃঙ্খলাসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে এক ধরণের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হবে। এমনকি রাজনৈতিক কোনঠাসা দশার সুযোগে নতুন করে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা।

আবার কেউ কেউ মনে করেন, সরকারের নানামুখী কঠোর চাপে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা কোনঠাসা না হয়ে বরং প্রচ- ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে জ্বালাও-পোড়াও ও ভাঙচুরসহ নানামুখি নৈরাজ্যে জড়িয়ে পড়তে পারে। যা ২০১৪ সালের জানুয়ারির মতো বোমাবাজি, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাযজ্ঞের আরও একটি কালো অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে।

সূত্র: যায়যায়দিন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here