বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে সাহসী তরুণ

আপনি কি বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে সাহসী তরুণের নাম জানেন? তাকে কেন সবচেয়ে সাহসী তরুণ বলতে হবে তার কারণ কি জানেন? তিনি কিভাবে কখন শহীদ হয়েছেন তাও কি জানেন আপনি?

পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে সাহসী তরুণ হলেন ইব্রাহিম আবু সুরাইয়া। তিনি ২৯ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি তরুণ ছিলেন। শুক্রবার ফিলিস্তিনের গাজা সীমান্তে তাকে গুলি করে হত্যা করেছে ইহুদিবাদী ইসরাইলের হানাদার সেনারা।

গাজার অধিবাসী ইব্রাহিমকে সর্বকালের সবচেয়ে সাহসী তরুণ বলার নেপথ্যে রয়েছে তার মহান আত্মত্যাগ ও অভাবনীয় বীরত্বের গল্প।

ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে দুই পা ও ডান চোখ হারানোর পরেও আট বছর ধরে ইহুদিবাদী দখলদারি থেকে মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে সোচ্চার ছিলেন ফিলিস্তিনি মুক্তিযোদ্ধা ইব্রাহিম আবু সুরাইয়া।

শুক্রবার জীবনের শেষ বেলাতেও ইসরাইলি বর্বতার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের মানুষের সাহসিকতার পরিচয় তুলে ধরতে প্রতিবাদে শামিল হন তিনি। কিন্তু কাপুরুষ ইসরাইলি সেনারা স্নাইপার রাইফেল দিয়ে গুলি করে হত্যা করে তাকে।

সবচেয়ে সাহসী মুক্তিযোদ্ধার কাহিনী

মুক্তিযোদ্ধা তরুণ ইব্রাহিম ছিলেন গাজার একটি জনাকীর্ণ শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা। বাবা-মা ছাড়াও তার ছয় বোন ও পাঁচ ভাই রয়েছেন।

উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস আক্রান্ত বাবা-মায়ের পক্ষে কাজ করার সম্ভব না হওয়ায় পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয় ইব্রাহিমের। মাছ ধরার পেশা বেছে নেন তিনি। এরমাধ্যমে প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৯ ডলার (এগারশ থেকে পনেরশ টাকা) টাকায় আয় করতে তিনি।

২০০৮ সালে ইব্রাহিমের বয়স তখন মাত্র কুড়ি বছর। ওই সময় মাত্র ২২ দিনে চৌদ্দশ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছিল ইসরাইলি হানাদার বাহিনী।

এমন হত্যাযজ্ঞ চলাকালেই সীমান্ত থেকে ইসরাইলি পতাকা নামিয়ে ফিলিস্তিনি পতাকা উড়ানোর এক দুঃসাহসী কাজ করে বসেন তিনি। এ সময় ইসরাইলি হেলিকপ্টার থেকে গুলি করলে ইব্রাহিম দুই পা ও এক চোখ হারান।

প্রতিনিয়ত ছুটে চলা তরুণ ইব্রাহিম প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়ার জীবনের করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি হন। যদিও গাজায় যুদ্ধাহতদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভাতা প্রাপ্তদের অন্যতম ছিলেন তিনি। কিন্তু প্রতিমাসে পাওয়া ২৪৮ ডলার (২০ হাজার টাকা) খরচ হযে যেত বিদ্যুৎ, ঘর বাড়া ও পানির বিল দিতেই।

এ অবস্থায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম হিসেবে জীবনযুদ্ধে নেমে পড়েন দুই পা ও এক চোখ হারানো ইব্রাহিম।

সকাল সাতটার সময় দিন শুরু হতো তারা। তিনি একটা পুরনো হুইলচেয়ারে করেই বালতি নিয়ে গাজার পথে পথে কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতেন। তারপর কাজ পেলে লাইন ধরে বালতিতে পানি ভরতেন এবং গাড়ি ধোয়ার (কারওয়াশ) কাজ করতেন।

আয়ারল্যান্ডের একটি সংবাদ মাধ্যমকে নিজেরে প্রতিবন্ধিত্ব নিয়ে ইব্রাহিম বলেছিলেন, কোনো গাড়ির মালিক যদি কাজ ছাড়া টাকা সাধে আমি তা নেই না। কারণ আমি কোনো ভবঘুরে বা ভিক্ষুক নই। আমি বাঁচার জন্য কাজ করতে পারি।

ইব্রাহিম জানান তিনি তাদের আরও বলেন, দয়া করে আমার শারীরিক প্রতিবন্ধিতার দিকে না তাকাবেন না। আমি কত ভালোভাবে কাজ করছি তা দেখুন। এখানেই পৃথিবী যায়নি, জীবন এগিয়ে চলবে।

তবে এ বছরের শুরুতে ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা শিহাব নিউজকে বলেছিলেন, তিনি বিদেশে গিয়ে কৃত্রিম পা সংযোজন করার স্বপ্ন দেখেন। তবে এজন্য যে প্রচুর টাকারও যে প্রয়োজন তা বলছিলেন ইব্রাহিম।

কৃত্রিম পায়ের স্বপ্ন পূরণ না হলেও প্রতিবন্ধী জীবনের কোনো দিনেই মাতৃভূমি ফিলিস্তিনের লড়াইয়ে ফাঁকি দেননি ইব্রাহিম। গত আট বছর ধরেই ইসরাইল বিরোধী সব সংগ্রামে শামিল ছিলেন।

সর্বশেষ গত ৬ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মুসলমানদের প্রথম কেবলা বায়তুল মুকাদ্দাসের নগরী জেরুসালেমকে অবৈধ ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করার পর ইব্রাহিম প্রতিদিনই বিক্ষোভে অংশ নেন।

ইব্রাহিমের সহোদর সামির বলেন, পবিত্র জেরুসালেমের জন্য হুইল চেয়ারে বসেই তিনি প্রতিদিনই সীমান্তে গিয়ে বিক্ষোভ করেন।

শুক্রবার নির্মমভাবে শাহাদাত বরণের দুদিন আগে ধারণ করা এক ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, ফিলিস্তিন ও ইসরাইল সীমান্তে হুইলচেয়ার ছাড়া শুধু হাতের উপর ভর করে হাটছেন ইব্রাহিম।

ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন করতে আহ্বান জানাচ্ছেন ফিলিস্তিনিদের।

ইব্রাহিম বলেন, এই ভূমি (সমগ্র ইসরাইল-ফিলিস্তিন) আমাদের ভূমি। আমরা কখনোই আমাদের ভূমি ছেড়ে যাব না। আমেরিকাকে তার ঘোষণা প্রত্যাহার করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো আমরা এখানে এসেছি ইহুদিবাদী দখলদার আর্মিকে একটা বার্তা দিতে, আর তাহলো ফিলিস্তিনের বীর জনগণ সর্বদা অকুতোভয় ও অনমনীয়।

শনিবার গাজায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনির অংশগ্রহণে ইব্রাহিম আবু সুরাইয়ার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ সংস্থা হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়া।

সূত্র: অনলাইন বাংলা

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here