ওমানের জাতীয় টুপি তৈরি করেন মিরসরাইয়ের নারীরা

সকালের চা-নাশতা শেষে বাড়ির উঠানে পাটি বিছিয়ে গল্পে মেতেছেন কয়েকজন নারী। তাঁদের সময়টা একেবারে যে অনর্থক কাটছে, তা নয়। সবার হাতে সুই-সুতা ও কাপড়। গল্পের ফাঁকে তাঁরা বুনে চলেছেন একধরনের টুপি। এই টুপি যাবে সুদূর ওমানে। সেখানে একেকটি টুপি বিক্রি হবে ৫ থেকে ৭ রিয়ালে (ওমানের রিয়ালের বিনিময়মূল্য ২১৫ টাকা)। টাকার অঙ্কে এই টুপির দাম ১ হাজার ৭৫ থেকে ১ হাজার ৫০৫ টাকা।

ওমান দেশটা কোথায়, কেমন, কত দূরে-এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই চট্টগ্রামের মিরসরাই পৌরসভার গৌভনীয়া গ্রামের বেশির ভাগ নারীর। অথচ তাঁদের হাতের কাজ করা টুপির খুবই কদর দেশটিতে। নির্দিষ্ট নকশার ওপর নানা রঙের সুতায় তাঁরা যে টুপি বুনে চলেছেন, তা ওমানের জাতীয় টুপি হিসেবে স্বীকৃত। এই টুপি দেশটিতে ‘কুপিয়া’ নামে পরিচিত। সাধারণত ‘কেন্দুয়া’র (পাঞ্জাবির মতো পোশাক) সঙ্গে কুপিয়া পরেন সেখানকার পুরুষেরা।

মিরসরাইয়ের গৌভনীয়া গ্রামের প্রায় ২০০ নারী টুপি তৈরির কাজ করেন। উপজেলার মঠবাড়িয়া গ্রামেও একই ধরনের টুপি বানানোর কাজে যুক্ত আরও প্রায় ২০০ নারী। টুপির নকশা, কাপড় ও সুতা-সবকিছুই সরবরাহ করা হয় তাঁদের। গৃহস্থালির ব্যস্ততা সামলে বা স্কুল-কলেজের পড়াশোনার ফাঁকে অবসর সময়টুকুতে নকশা অনুযায়ী হাতের কাজ করা একেকটি টুপির জন্য গ্রামের একেকজন নারীকে দেওয়া হয় ৫০০ থেকে ৯০০ টাকা। তবে হাতের কাজ অতি সূক্ষ্মভাবে করতে হয় বলে একজনের পক্ষে মাসে দুটি বা তিনটির বেশি টুপি তৈরি করা সম্ভব হয় না। পারিশ্রমিকের তারতম্য হয় কাজের গুণ ও মান অনুযায়ী।

মিরসরাই পৌরসভার গৌভনীয়া এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর শাহানা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, টুপি তৈরির কাজে যুক্ত হওয়ায় মেয়েরা সংসারে কিছুটা হলেও আর্থিক সাহায্য করতে পারছেন। প্রত্যন্ত গ্রামে এটা অনেক বড় ব্যাপার। এতে সংসারে নারীর মর্যাদা বাড়ছে। এ ধরনের কাজের ফলে পরিবার, সমাজ এমনকি দেশও উপকৃত হচ্ছে।

গ্রামের নারীদের এই বাড়তি কিছু টাকা আয়ের সুযোগ করে দিয়েছেন সেলিম নামের এক যুবক। হাতে কাজ করা টুপি ওমানে পাঠিয়ে নিজেও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এই উদ্যোক্তা। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে টুপি পাঠান সেলিম। ৩০ কেজির একটি কার্টনে ৩৫০ থেকে ৪০০ টুপি পাঠানো যায়। প্রতি মাসে তিন-চার কার্টন টুপি পাঠান তিনি। ভরা মৌসুমে (দুই ঈদের সময়) মাসে তিন থেকে চার লাখ টাকা আয় তাঁর।

সেলিমের পুরো নাম কাজী এমদাদ হোসেন। মিরসরাইয়ের নিজামপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে চট্টগ্রাম শহরে একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিলেন ডিপ্লোমা কোর্সে। প্রথম বর্ষ শেষ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য আয়ারল্যান্ডে যেতে ছোটাছুটি করেছিলেন কিছুদিন।
সেলিমের বাবা কাজী নুরুল আলম থাকতেন ওমানে। সেখানে প্রথম দিকে গাড়ি চালাতেন। পরে একটি তৈরি পোশাকের দোকান খোলেন। ব্যবসা দেখাশোনার জন্য একে একে তিন ছেলেকে ওমানে নিয়ে যান তিনি। কিন্তু বাড়িঘর, জমি ও মাকে দেখার জন্য কেউ রইল না বলে দেশেই থেকে যেতে হলো সেলিমকে। এ নিয়ে পরিবারের ওপর একটু অভিমানও ছিল তাঁর।
বেকার জীবন যখন একরকম হতাশ করে তুলেছিল সেলিমকে, তখন দেশে এসেছিলেন মেজ ভাই রবিউল হোসেন। সেটা ২০০৪ সাল। মেজ ভাই তাঁকে ওমানে হাতের কাজ করা টুপির কদর আছে বলে এখান থেকে সে রকম টুপি তৈরি করে পাঠানো যায় কি না ভেবে দেখতে বলেন। সেখান থেকে একটা টুপির নকশাও নিয়ে এসেছিলেন তিনি। ভাইয়ের পরামর্শে মিরসরাইয়ে নিজের গ্রাম সাহেরখালীর নারীদের দিয়ে ১০-১২টি টুপি তৈরি করে পাঠান ওমানে। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সেখানে বিক্রি হয়ে যায় টুপিগুলো। সেদিনই যেন নিজের ভবিষ্যৎটা দেখতে পেয়েছিলেন সেলিম। পুরোদমে লেগে পড়লেন কাজে।

আশপাশের গ্রামের নারীদের ডেকে, তাঁদের কাজের ধরনটা বুঝিয়ে দিয়ে টুপির কাপড়, নকশা ও সুই-সুতা দিয়ে আসতেন সেলিম। ১৫-২০ দিন পর গিয়ে তাঁদের কাছ থেকে নিয়ে আসতেন তৈরি করা টুপি। মোটরসাইকেল নিয়ে এগ্রাম-ওগ্রাম, এবাড়ি-ওবাড়ি ছোটাছুটি করতেন তখন। ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। জনে জনে যোগাযোগ রাখা কঠিন। তাই একেক অঞ্চলে একেকজন করে প্রতিনিধি নিয়োগ করেন তিনি। এখন তাঁদের ডেকে কাজ বুঝিয়ে দেন, তাঁরাই নারীদের কাজ দেওয়া ও বুঝে নেওয়ার কাজটি করেন। বিনিময়ে তাঁরা কমিশন হিসেবে প্রতিটি টুপির জন্য ৫০ টাকা করে পান। এভাবে বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে সেলিমের কর্মক্ষেত্র। এখন নিজের বাড়ি মিরসরাই ছাড়াও সীতাকুণ্ড, কক্সবাজারের চকরিয়া, রামু, এমনকি রংপুরের কিছু কিছু এলাকায়ও সেলিমের টুপি তৈরির কাজ চলে। ১০ জন তত্ত্বাবধায়কের আওতায় খণ্ডকালীন নারী কর্মীর সংখ্যাও এখন প্রায় পাঁচ হাজার।

২০১২ সালের ১ ডিসেম্বর ‘গ্রামীণফোন-পূর্বকোণ’ আয়োজিত ‘চট্টগ্রামের অহংকার’ শিরোনামের একটি অনুষ্ঠানে অন্য গুণীজনদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সেরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পদক জুটেছিল সেলিমের। এ ছাড়া মিরসরাই উপজেলা পরিষদও বিশেষ সম্মাননা স্মারক দিয়েছেন তাঁকে। এই ব্যবসা তাঁকে সামাজিকভাবে সম্মানিত করেছে। একসময় যে স্কুলে তিনি পড়াশোনা করেছেন, সেই সায়েরখালী উচ্চবিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মনোনীত করা হয়েছে তাঁকে। বছর কয়েক আগে কজন বন্ধু মিলে ‘সায়েরখালী আইডিয়াল গ্রামার স্কুল’ নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তুলেছেন তিনি।

তাঁর দেখাদেখি ওমানে টুপি রপ্তানির ব্যবসা এখন অনেক যুবকই করছেন বলে জানান সেলিম। ফেনীর দাগনভূঞা, নোয়াখালীর চর আলেকজান্ডার, নওগাঁ, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্যোক্তা যেমন আছেন, তেমনি আছেন এ কাজের কারিগর গ্রামের বউ-ঝিরা। নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই, তবে সারা দেশের অন্তত ৫০ হাজার নারী এখন এই কাজ করে সংসারে বাড়তি কিছু আয়ের ব্যবস্থা করতে পারছেন বলে জানান তিনি। উদ্যোক্তারাও সবাই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।

সেলিম বলেন, ‘অন্য ব্যবসার চেয়ে এ কাজের তফাতটা কী জানেন? গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মানুষের ভালোবাসা পাই, সম্মান পাই। সবাই ভাবে, এই মানুষটা ভালো, এই মানুষটা তাদের কিছু উপকার করছে।…এর চেয়ে আনন্দ আর কী হতে পারে?’

সেলিমের এই কথার সত্যতা পাওয়া যায় মিরসরাইয়ের গৌভনীয়া গ্রামে গিয়ে। গ্রামের নারী-পুরুষ সবার সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক তাঁর। গ্রামের একটি বাড়ির উঠোনে বসে টুপি তৈরির কাজ করছিলেন নীলুফার ইয়াসমিন, সায়রা আক্তার, রোজিনা আক্তার, রোজিনা বেগম, সেলিনা আক্তারসহ আরও কয়েকজন। এই দলের ফোরম্যান শারমীন আক্তার মিরসরাই বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বিএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তিনি বললেন, ‘ক্লাস সেভেনে থাকার সময় আমি এই টুপি তৈরির কাজ শিখেছি। তখন থেকেই পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে কাজ করে উপার্জন করেছি। এখন পড়াশোনার চাপ বেশি। নিজে কাজ কম করতে পারি, অন্যদের কাজ দেখভাল করি।’

সেলিম বলেন, চীন ও অন্যান্য দেশ থেকে মেশিনে তৈরি টুপি ওমানে যায়। ক্রেতাদের কাছে সেগুলোর কদর কম, দামও কম। বাংলাদেশের নারীদের হাতে বানানো টুপির অনেক সুনাম সেখানে।

সূত্র: প্রথম আলো

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here