আ.লীগ নেতাদের নায়িকা-গায়িকা নিয়ে ঘোরাঘুরি, হেলিকপ্টার নিয়ে ওড়াউড়ি

নঈম নিজাম

সরকারি দলের অনেক সমর্থকের বাস আসমানে, মাটিতে নয়। মাটিতে তারা পা রাখতে চান না। আর চান না বলেই বাস্তবতা মানতে তাদের কষ্ট। রংপুরে সরকারি দলের বিশাল বিপর্যয় একটি বাস্তবতা। অথচ এ নিয়ে কথার ফুলঝুরি চলছে। আসমানে হেঁটে হেঁটে দেওয়া হচ্ছে নিত্যনতুন ব্যাখ্যা। এভাবেই কুমিল্লা ভোটের পর আকাশে হেঁটে বেড়ানো মানুষগুলোর কথা শুনেছিলাম। একজন তো আমাকে বললেন, কুমিল্লার মানুষগুলো বড় খারাপ। ভাবখানা এমন সারা বাংলাদেশ অপেক্ষা করছে আওয়ামী লীগের জন্য। শুধু দোষ করেছিল কুমিল্লাবাসী। এখন রংপুর নিয়ে কী বলবেন?

সেই সময়ে মাটির দিকে তাকালে রংপুরে ভোটের এই বিশাল ব্যবধান হতো না। ভোটে হারজিত থাকবে। কিন্তু ব্যবধান এত হবে কেন? আরে ভাই ভোটাররা একবার কেন্দ্রে প্রবেশ করলে কোন দিকে অবস্থান নেবে কেউ জানে না। কল্পনার জগৎ ছেড়ে বাস্তবে আসুন। ভোটারদের সম্মান করতে শিখুন। তাদের অপমান বন্ধ করুন। এই ভোটাররাই ’৭০ সালে বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশ স্বাধীন করার অধিকার দিয়েছিল। এই ভোটাররা জেগে উঠলেই তৈরি হয় নতুন ইতিহাস। আপনার আমার আস্থা থাকুক না থাকুক তাতে কিছু যায় আসে না। আওয়ামী লীগের প্রতি অতি ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে চাটুকারিতা, অবাস্তব কথা বন্ধ করুন। কুমিল্লার ভোটের পর অনেক ব্যাখ্যা শুনেছি। মনে রাখবেন, চাটুকারিতা আর অতি ভালোবাসা কখনই ভালো নয়। বাস্তবতাকে মেনে নিলেই সংকটের নিরসন হয়। কুমিল্লা থেকে শিক্ষা নিলে রংপুরে এ বিপর্যয় হতো না। আওয়ামী লীগ কুমিল্লা থেকে শিক্ষা নেয়নি। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়াই ইতিহাসের শিক্ষা।

বিএনপির একটি গ্রুপ রংপুরের ভোট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অনেক কথা বলছেন। কী আশ্চর্য সত্যকে আড়াল করাই যেন ওদের রাজনীতি। আমাদের টেলিভিশন ও পত্রিকা থেকে কয়েকজন রিপোর্টারকে পাঠিয়েছিলাম রংপুরে। তাদের সঙ্গে প্রতিদিন আমার কথা হতো। ভোটের দিনও কথা হয় বার বার। জানতে চেয়েছিলাম, ভোট নিরপেক্ষ হচ্ছে তো। শুরু থেকেই সবার এক উত্তর ভোট শতভাগ শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য। উচ্ছ্বাস নিয়ে ভোটাররা কেন্দ্রে আসেন। তারপরও অনেকের প্রশ্ন কেন এই ফলাফল? ব্যাখ্যা অনেক। রংপুর জাতীয় পার্টির রাজধানী। এরশাদ এই রাজধানীতে দাপুটে নেতা। ১৯৯১ সালে রংপুরের মানুষ তাকে পাঁচ আসনে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু রংপুরের সর্বশেষ মেয়র ছিলেন আওয়ামী লীগের ঝন্টু। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে রংপুরে জাতীয় পার্টিকে বাদ দিয়েই আওয়ামী লীগ বেশির ভাগ আসন তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। এবারও আওয়ামী লীগের আশাবাদ ছিল ঝন্টুকে নিয়ে।

আমার কথা হলো, আওয়ামী লীগ হারতেই পারে। কিন্তু ভোটের ব্যবধান এক লাখ কেন? আওয়ামী লীগকে ভাবতে হবে। এ নিয়ে একটি পুরনো গল্প আছে। গল্পটি না বলে পারছি না। এক শোকের বাড়িতে এক তরুণকে চিৎকার করে বেশি কাঁদতে দেখে পড়শিরা প্রশ্ন করল, যিনি মারা গেছেন তিনি তোমার কে হন? জবাবে তরুণটি বলল, দূরসম্পর্কের চাচা! তখন সবাই বলল, দূরের চাচার মৃত্যুতে এত কান্নাকাটি, বাপ মরলে কী করবে? জবাবে তরুণটি বলল, চাচার জন্য কাঁদছি না। আজরাইল বাড়ি চিনে গেল তাই কাঁদছি। আজরাইল একবার বাড়ি চিনলে সহজে ছাড়তে চায় না। বাড়ির চারদিকে ঘোরাফেরা করে। আমি রাজনীতির সঙ্গে গল্পটি মেলাচ্ছি না। তবে বাস্তবতায় ফিরে আসতে হবে সরকারি দল, তাদের সমর্থকদের।

সরকারি দলের পুরনো সমর্থকদের নিয়ে সমস্যা নেই। তারা বাস্তবতা বোঝেন। সমস্যা নবাগত, বহিরাগত আর হাইব্রিডদের নিয়ে। নবাগতরা বড্ড বেশি উৎসাহী। তারা সবকিছুতেই বাস্তবতার বাইরে হাস্যকর ব্যাখ্যা বানান। এই চক্রকে বলছি, দয়া করে বিভ্রান্তি বন্ধ করুন। কারণ কুমিল্লার পর রংপুরের বিপর্যয়। এরপর আরও ভোট আছে। আরও ছয় সিটিতে ভোট হবে। সামনে ঢাকা উত্তর সিটির ভোট। তারপর গাজীপুর। এরপর সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশালে ভোট। রংপুরের পরাজয়ের কারণ বের করুন। সরফুদ্দিন ঝন্টু বিশাল জনপ্রিয়তা নিয়েই সর্বশেষ মেয়র হয়েছিলেন। গত পাঁচ বছর রংপুর শহরে পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়নি। দলের নেতা-কর্মীরা গ্রুপিং নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।

ঝন্টুর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে। কর্মীরা ঠিকভাবে কাজ করেননি। সমন্বয়ের অভাব ছিল কুমিল্লার চেয়ে একধাপ বেশি। ভোট হয়েছে নিরপেক্ষ। আর নিরপেক্ষতার অর্থই হলো ক্ষমতাসীনদের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া রাজনীতির নিত্যনতুন ঠিকাদাররা রংপুরকে কলুষিত করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। হেলিকপ্টার নিয়ে ওড়াউড়ি, নায়িকা, গায়িকা নিয়ে ঘোরাঘুরি রংপুর আওয়ামী লীগ রাজনীতির বারোটা বাজিয়েছিল। এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে সময় লাগবে। তবে রংপুর থেকে শিক্ষা কাজে লাগবে অন্য ভোটগুলোতে। রংপুর দিয়ে ভোট শেষ নয়। শুরু। ছোটবেলায় শুনতাম এই দিন দিন নয়। আরও দিন আছে। এই দিন নিয়ে যাবে সেই দিনের কাছে। সেই দিনের কাছে যাওয়ার আগে প্রস্তুতি নিন। ঘোড়ায় চড়ে ভোট চাওয়ার দিন শেষ। ভোট চাইতে হবে মানুষের কাছে। মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে সাময়িক চলা যায়। দীর্ঘ সময় নয়।

লেখক: বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here