২০ আসন দিলেই সরকারের পক্ষে হেফাজতে ইসলাম!

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করার চেষ্টা করছে হেফাজতে ইসলামের ছায়ায় থাকা কয়েকটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে ‘সহযোগিতা’ চেয়ে একটি চিঠির খসড়া প্রস্তুত করেছে ইসলামী ঐক্যজোট। হেফাজতে ইসলামকে ‘সরকারের পক্ষে’ রাখার শর্তে চাইছে ২০টি আসনে ‘দিকনির্দেশনা’।

চট্টগ্রামের হাটহাজারীর শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বাধীন হেফাজতে ইসলাম অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠনের দাবিদার হলেও প্রায়ই রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং পাঁচটি রাজনৈতিক দলের প্রধান এই সংগঠনের নায়েবে আমির। তারই একটি ইসলামী ঐক্যজোট।

প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠানোর জন্য খসড়া চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘২০টি আসন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে আসনগুলোতে আপনার দিকনির্দেশনা, সহযোগিতা আমরা একান্তভাবে কামনা করি।’

তা ছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ত্যাগের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আগামী ৭ জানুয়ারি ঢাকায় মহাসমাবেশ করতে চায় ইসলামী ঐক্যজোট। এখান থেকে ধর্মভিত্তিক মোর্চা গঠনের ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন তারা। মহাসমাবেশ আয়োজনেও প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চেয়েছে দলটি।

কয়েকটি দলের জোট হলেও ইসলামী ঐক্যজোট একক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হয়েছে। ঐক্যজোটের নেতারা এ চিঠির কথা অস্বীকার করেছেন। তবে এর একটি কপি সমকালের কাছে রয়েছে।

ইসলামী ঐক্যজোটের কোনো চিঠি প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কাছে পৌঁছেছে কি-না সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতারাও কথা বলতে রাজি হননি। এ দলগুলোর সঙ্গে ভবিষ্যতে নির্বাচনী সমঝোতার সম্ভাবনা সম্পর্কে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ সমকালকে বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। চিঠি সম্পর্কেও অবগত নন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘না জেনে মন্তব্য করতে চাই না।’

প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানোর উদ্দেশ্যে গত ২৬ অক্টোবর দুপুর ২টা ১১ মিনিটে এ চিঠির খসড়া নিজাম-ই-ইসলামী পার্টির অফিসিয়াল ই-মেইল ঠিকানা থেকে ইসলামী ঐক্যজোটের অফিসিয়াল ই-মেইল ঠিকানায় পাঠানো হয়। গত ৩ নভেম্বর বিকেল ৪টা ২৩ মিনিটে সংশোধিত খসড়া ইসলামী ঐক্যজোটের ই-মেইল থেকে নিজাম-ই-ইসলামীর ই-মেইলে পাঠানো হয়। অন্য ই-মেইলে কপি (সিসি) দেওয়া হয়।

নিজাম-ই-ইসলামী পার্টি ইসলামী ঐক্যজোটের শরিক। খসড়ায় বলা হয়েছে, খেলাফত আন্দোলন, মুসলিম লীগসহ বিভিন্ন নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে নিয়ে মোর্চা গঠন করবে ইসলামী ঐক্যজোট। এ মোর্চা আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ২০টি আসনে তারা ‘সহযোগিতা’ চান।

দলীয় প্যাডে লেখা চিঠির খসড়ায় কারও সই নেই- এ যুক্তিতে চিঠি পাঠানোর সত্যতা অস্বীকার করেন ইসলামী ঐক্যজোটের প্রচার বিভাগের দায়িত্বে থাকা যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল। তবে সমকালকে তিনি নিশ্চিত করেছেন, ই-মেইল ঠিকানাটি ইসলামী ঐক্যজোটের। তার দাবি, কেউ দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এ ভুয়া চিঠি পাঠিয়েছে। অন্য কারও পক্ষে অফিসিয়াল ই-মেইল ব্যবহার করা সম্ভব কি-না? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি তিনি। ই-মেইল হ্যাক হয়েছিল এমন অভিযোগও নেই তার।

যোগাযোগ করা হলে ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নিজামী দাবি করেন, তারা এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ লক্ষ্যে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। তবে এ জন্য সরকারের সহযোগিতা চাওয়া কিংবা চিঠি পাঠানোর সত্যতা অস্বীকার করেন তিনি।

দলের অফিসিয়াল ই-মেইল ঠিকানায় এ-সংক্রান্ত চিঠি চালাচালি হয়েছে- এ তথ্য জানানোর পর তিনি সমকালকে বলেন, ‘ই-মেইলের বিষয়ে কিছুই জানি না।’ চিঠি পাঠানোর বিষয়ে এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘কেউ লিখতে পারে, আমি লিখিনি।’

হেফাজতের সঙ্গে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রায় ৬০ লাখ ভোট রয়েছে বলে দাবি করেছেন আবদুল লতিফ। এ ভোট আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘পক্ষে’ রাখতে ইসলামী ঐক্যজোট হেফাজতকেও সরকারের পক্ষে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে লেখা চিঠিতে বলা হয়, ‘হেফাজত একটি ইস্যুভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর তেমন প্রয়োজনীয়তা নেই। ইসলামী ঐক্যজোট একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক সংগঠন। আমরা বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ইসলামী ঐক্যজোটকে শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।’

১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত চারদলীয় জোটে যোগ দেয় শায়খুল হাদিস আজিজুল হকের নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোট। ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন করে চারটি আসনে জয়ী হয় এ জোট। তবে মন্ত্রিসভায় স্থান না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়। জোট সরকারের শাসনামলেই ইসলামী ঐক্যজোটে ভাঙন ধরে। আজিজুল হককে সরিয়ে দলের চেয়ারম্যান হন মুফতি ফজলুল হক আমিনী।

২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচন উপলক্ষে আজিজুল হকের নেতৃত্বে ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে যোগ দেয়। ‘ব্লাসফেমি’ আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতিসহ দলটির সঙ্গে পাঁচ দফা চুক্তি করে আওয়ামী লীগ। পরে সমালোচনার মুখে আওয়ামী লীগ এ চুক্তি থেকে সরে আসে।

মুফতি আমিনীর মৃত্যুর পর বর্তমানে ইসলামী ঐক্যজোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আবদুল লতিফ নিজামী ও মুফতি ফয়জুল্লাহ। প্রথমজন হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির ও দ্বিতীয়জন যুগ্ম মহাসচিব। যোগ্য সম্মান না পাওয়ার অভিযোগ এনে ঐক্যজোট গত বছরের ৭ জানুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করে। মুফতি ফয়জুল্লাহ চট্টগ্রামের একটি আসন থেকে নির্বাচনে দাঁড়াতে চান। ২০১৩ সালে হেফাজত সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনায় একাধিক মামলার আসামি তিনি। তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা থাকলেও বিএনপি জোট ত্যাগের পর তিনি নির্বিঘ্নে প্রকাশ্যে মিছিল-সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন। নিয়মিত লালবাগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অফিস করছেন।

২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের সহিংসতার ঘটনায় সরকারের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের সম্পর্কের অবনতি হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনটির সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের সম্পর্কোন্নয়ন ঘটেছে। গত ১৩ এপ্রিল দাওরায়ে হাদিসের স্বীকৃতি ঘোষণার অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে গণভবনে যান হেফাজতের আমির শাহ আহমদ শফী।

ইসলামী ঐক্যজোট ও খেলাফত আন্দোলন ছাড়াও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিসের মতো নিবন্ধিত দলগুলোর সঙ্গে হেফাজতের অংশীদারিত্ব রয়েছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও খেলাফত মজলিস এখনও বিএনপি জোটের শরিক।

সূত্র: সমকাল

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here