ভুয়া সংগঠনের নামে ‘বিশ্বে ৩য় সৎ শেখ হাসিনা’ প্রচারণা!

কদরুদ্দীন শিশির

“শেখ হাসিনা বিশ্বের ৩য় সৎ সরকার প্রধান” শীর্ষক সংবাদটি গত দুই দিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচিত হচ্ছে। সর্বশেষ বুধবার জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই কথিত সংবাদের প্রেক্ষিতে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

প্রথমেই দেখে নেয়া যাক সংবাদটি কী ছিল?

বাংলা ইনসাইডার নামে একটি অনলাইন পোর্টাল সংবাদটি প্রথম প্রকাশ করে গত ২০ নভেম্বর। শিরোনাম ছিল, “শেখ হাসিনা বিশ্বের ৩য় সৎ সরকার প্রধান”।

আহরাম বিডির পাঠকদের বুঝার সুবিধার্থে পুরো সংবাদটি এখানে কপি করে তুলে ধরা হল-

“প্যারাডাইস পেপারস আর পানামা পেপারস নিয়ে যখন কলঙ্কিত বিশ্ব রাজনীতি। রাজনীতির সঙ্গে যখন দুর্নীতি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যাচ্ছে, তখন তার আশ্চর্য ব্যাতিক্রম কয়েকজন। পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস, বিশ্বের ৫ জন সরকার রাষ্ট্রপ্রধানকে চিহ্নিত করেছেন, যাদের দুর্নীতি স্পর্শ করেনি, বিদেশে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই, উল্লেখ করার মতো কোনো সম্পদও নেই। বিশ্বের সবচেয়ে সৎ এই পাঁচজন সরকার প্রধানের তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিশ্ব রাজনীতিতে যাদের সৎ ভাবা হতো, যাদের অনুকরণীয় মনে করা হতো – তাদের অনেকেই কলঙ্কিত হয়েছেন পানামা পেপারস এবং প্যারাডাইস পেপারসে। রানি এলিজাবেথ থেকে শুরু করে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডার নাম এসেছে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনে। পানামা পেপারস এর ধাক্কায় মন্ত্রিত্ব ছেড়েছেন নওয়াজ শরিফ, আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমুন্ডুর ডেভিড গুনলাগসন। তথাকথিত সৎ দেশগুলোকে কাঁপিয়ে দিয়েছে গোপনে কর স্বর্গে বিনিয়োগের ফাঁস হওয়া তথ্যভাণ্ডার।

বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স’ এই প্রেক্ষাপটে সৎ নেতার সন্ধান করেছে। ৫ টি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেতৃত্বের সততার মান বিচার হয়েছে। প্রথম প্রশ্ন ছিল, সরকার/রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে তিনি কি তাঁর রাষ্ট্রের বাইরে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করেছে? দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ক্ষমতায় আসীন হবার পর তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ কতটুকু বেড়েছে। তৃতীয় প্রশ্ন ছিল, গোপন সম্পদ গড়েছেন কিনা। চতুর্থ প্রশ্ন সরকার/রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ আছে কিনা। আর পঞ্চম প্রশ্ন ছিল, দেশের জনগণ তাঁর সম্পর্কে কী ভাবেন?

এই ৫ টি উত্তর নিয়ে পিপলস অ্যান্ড পরিটিক্স ১৭৩ টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করেছে। এই গবেষণায় সংস্থাটি এরকম মাত্র ১৭ জন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান পেয়েছেন যাঁরা শতকরা ৫০ ভাগ দুর্নীতিমুক্ত হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ১৭৩ জন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও সৎ সরকার প্রধান হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। ৫ টি প্রশ্নে মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে তিনি পেয়েছেন ৯০। সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লং, ৮৮ পেয়ে সৎ সরকার প্রধানদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থান পেয়েছেন। ৮৭ নম্বর পেয়ে এই তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৮৫ নম্বর পেয়ে বিশ্বে চতুর্থ সৎ সরকার প্রধান বিবেচিত হয়েছেন নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইরনা সোলাবার্গ। আর ৮১ নম্বর পেয়ে এই তালিকায় পঞ্চম স্থানে আছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি।

পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্সের গবেষণায় দেখা গেছে, শেখ হাসিনার বাংলাদেশের বাইরে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। সংস্থাটি গবেষণায় দেখেছে, বেতন ছাড়া শেখ হাসিনার সম্পদের স্থিতিতে কোনো সংযুক্তি নেই। শেখ হাসিনার কোনো গোপন সম্পদ নেই বলে নিশ্চিত হয়েছে পিপলস অ্যন্ড পলিটিক্স। শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের ৭৮ ভাগ মানুষ মনে করেন সৎ এবং ব্যক্তিগত লোভ লালসার উর্ধ্বে। তবে, তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে কিছু দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে সংস্থাটির গবেষণা প্রতিবেদেন উল্লেখ করা হয়েছে।”

সংবাদের মূল কথাটি শিরোনামেই আছে। একটি গবেষণায় শেখ হাসিনাকে বিশ্বের ৩য় সৎ সরকারপ্রধান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণা পরিচালনাকারী সংস্থার নাম উল্লেখ করা হয়েছে, ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স’ (Peoples and Politics)।

কিন্তু এই নাম দিয়ে গুগল সার্চ করে কোনো সংস্থার নাম পাওয়া যায়নি। এমনকি কোনো সংস্থার অধীনে Peoples and Politics শিরোনামে কোনো গবেষণা পরিচালিত হওয়ার কোনো প্রমাণ/তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া ‘world’s honest leaders’, ‘world’s honest politicians’, ‘Honest World Leaders’ ইত্যাদি কীওয়ার্ড দিয়ে সার্চ করেও কোনো প্রাসঙ্গিক ফলাফল পাওয়া যায়নি। শুধু প্রথম কীওয়ার্ডের সার্চে বাংলা ইনসাইডার পোর্টালটির ইংলিশ ভার্সনের একটি সংবাদ এসেছে “Sheikh Hasina world’s 3rd honest politician”.

উল্লেখ্য, বাংলা ইনসাইডার নামে এই নামসর্বস্ব নিউজ পোর্টালটি প্রায় সময়ই সরকারের পক্ষে গুজব সংবাদ ছড়িয়ে থাকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি নিয়েও এই পোর্টালটি বেশ কিছু গুজব ছড়িয়েছিলো।

তথ্যসূত্র: বিডিফ্যাক্টচেক

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here