বেলফোর ঘোষণার জন্য ব্রিটেনের ক্ষমা চাওয়া উচিত

ফিলিস্তিনের আদি অধিবাসী মুসলিমদের উচ্ছেদ করে সেখানে ইহুদিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থনে ব্রিটেনের তৎকালীন সরকার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সিদ্ধান্তের কথা সে সময়ের ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর একটি চিঠিতে জায়নবাদী আন্দোলনের নেতা ওয়াল্টার রথসচিল্ডকে জানান। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর লেখা এ চিঠিকে বেলফোর ডিকলারেশন বা বেলফোর ঘোষণা বলা হয়। আগামী ২ নভেম্বর বেলফোর ঘোষণার ১০০ বছর পূর্ণ হবে। সে উপলক্ষে প্রফেসর কামাল হাওয়াশ মিডলইস্টমনিটরে ব্রিটেন শুড অ্যাপোলোজাইজ ফর দ্য বেলফোর ডিকলারেশন, নট সেলিব্রেট ইট বা উদযাপন নয়, বেলফোর ঘোষণার জন্য ব্রিটেনের ক্ষমা চাওয়া উচিত শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রফেসর কামাল ব্রিটেনের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। এ ছাড়া তিনি মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক একজন সমালোচক এবং প্যালেস্টাইন সলিডারিটি ক্যাম্পেইন ও ব্রিটিশ প্যালেস্টাইন পলিসি কাউন্সিলের ভাইস চেয়াম্যান। প্রবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন মীম ওয়ালীউল্লাহ।

তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর জায়নবাদীদের প্রতি ব্রিটেন এবং আয়ারল্যান্ডের সমর্থনের কথা উল্লেখ করে ওয়াল্টার রথসচিল্ডকে ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর একটি চিঠি লিখেছিলেন। এ চিঠির গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো- ‘ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সরকার একমত পোষণ করেছে। ইহুদিদের এ লক্ষ্যে উপনীত করতে ব্রিটেন সবধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেবে। এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনের বর্তমান জনগোষ্ঠীর (মুসলমানদের) ধর্মীয় এবং নাগরিক অধিকার অথবা অন্যান্য দেশে ইহুদিদের বিভিন্ন অধিকার ও রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে পাওয়া সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তার কিছুই হবে না।’ চিঠির এ বক্তব্যের মাধ্যমে ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের একটি প্রাথমিক উদাহরণ পাওয়া যায়। ফিলিস্তিনের আদি অধিবাসীদের মতামতের তোয়াক্কা না করেই সেখানে ইহুদিবাদী ভূখণ্ড চাপিয়ে দিতে জায়নবাদীদের কাছে প্রতিশ্রুতি দেয় ব্রিটেন।

২০১৭ সালে বেলফোর অঙ্গীকারের শতবর্ষ পূর্ণ হতে চলেছে। জোরালো গুঞ্জন উঠেছে, বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বেলফোর ঘোষণা উদযাপনের পরিকল্পনা নিচ্ছে ব্রিটিশ সরকার। ব্রিটেনে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত মার্ক রিযেব দাবি করেছেন, এ নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গুরুত্বের সাথে আলোচনা হয়েছে। ব্রিটিশ সরকার এবং জনগণকে সাথে নিয়ে এটা উদযাপন করা হবে বলে আমরা আশা করছি। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখপাত্র এ বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের সাথে কথা বলেছেন। বেলফোর উদযাপন উপলক্ষে উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন নেতারা একত্র হবেন। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ইহুদি নেতাদের বলেছেন, যথাযথভাবে একসাথে আমরা দিনটিকে উদযাপন করতে যাচ্ছি। তবে কিভাবে এবং কোথায় দিনটি স্মরণ করা হবে এ ব্যাপারে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশদের সাথে কোনো পরামর্শ করেননি ক্যামেরন।

ফিলিস্তিন-ইসরাইল ইস্যুতে ব্রিটেনের দ্বিমুখী আচরণ প্রকাশ হয়েছে। একটি মরুভূমিতে ইসরাইলকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বিষয়টি এমন নয়; বরং ফিলিস্তিনি জনগণের আদি আবাসস্থলে একটি ইহুদিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। ফলে ফিলিস্তিনিদের সাথে আলোচনা না করেই ব্রিটেনের বেলফোর ঘোষণার শতবর্ষ উদযাপন পরিকল্পনা কিভাবে যৌক্তিক হতে পারে?

ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ও ফিলিস্তিনের নেতাদের মতে, বেলফোর ঘোষণা উদযাপন পরিকল্পনা ব্রিটেনের চরম আগ্রাসী উদ্যোগ। জায়নবাদীদের জন্য এ ঘোষণা সবুজ সঙ্কেত। এ ঘোষণার মাধ্যমে ‘ফিলিস্তিনিকে ভূমিশূন্য জনগণের জন্য জনশূন্য ভূমি’ অভিহিত করে একটি সর্বৈব মিথ্যাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। ফিলিস্তিনে ইহুদিদের অবৈধ বসতি স্থাপন বেলফোর ঘোষণা এবং তৎকালীন জাতিপুঞ্জর ম্যানডেটের ফলাফল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং এ সময় চলা গণহত্যার পর ইহুদিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বন্দোবস্ত চূড়ান্ত হয়।

ব্রিটেনের তৎপরতায় জায়নবাদীরা ফিলিস্তিনের জনগণকে তাদের নিজ ভূমি থেকে তাড়িয়ে ইসরাল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালায়। এর পর থেকে অবৈধভাবে জন্ম নেয়া রাষ্ট্রে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ইহুদিরা বসতি স্থাপনে আগ্রাসন চালিয়ে আসছে।
এর মধ্যে ব্রিটেন কিভাবে বেলফোর ঘোষণা উদযাপন করবে? এটাকে উদযাপন না বলে শুধু ‘স্মরণে’র কথাও যদি বলা হয়, এরপর এ আয়োজন ফিলিস্তিনিদের কাছে অন্যায় বলেই গণ্য হবে। কেননা এ ঘোষণার কারণেই আজো ইহুদিবাদী ইসরাইলি বাহিনীর নির্যাতন ও উচ্ছেদের শিকার হচ্ছেন ফিলিস্তিনের জনগণ।

বেলফোর ঘোষণাপত্রটি একটু নিরপেক্ষভাবে পড়লে দেখা যাবে, ইসরাইল প্রতিষ্ঠায় ‘সহায়তার’ যে শর্ত ব্রিটেনের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছিল তা তারা পূর্ণ করেছে।

১৯৪৮ সালে অবৈধভাবে চেপে বসার পর থেকে আজ পর্যন্ত ইহুদিরা ফিলিস্তিনের আদি জনগণ অর্থাৎ মুসলিমদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার অব্যাহতভাবে হরণ, নির্যাতন ও নিগ্রহ করে চলেছে। ব্রিটেন কখনো ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ২০১৭ সালে পূর্ব জেরুসালেম, গাজা এবং অন্যান্য আরব ভূমি দখলেরও ৫০ বছর পূর্ণ হবে। ফলে যেকোনো মানুষ বেলফোর উদযাপন সঠিক নয় বলে মনে করে। ব্রিটেন বেলফোর উদযাপনের পরিবর্তে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চাইতে পারে।

সূত্র: নয়াদিগন্ত

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here