পিলখানায় সেনা অভিযান কেন হয়নি? পরস্পরকে দায়ী করলেন শেখ হাসিনা-মঈন (ভিডিও)

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধেও এতজন সেনা অফিসার নিহত হয়নি পিলখান হত্যাকাণ্ডে যতজন সেনা অফিসার হত্যার শিকার হয়েছিলো। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সেনা হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনার বিচারের রায় ঘোষনা হলো আজ সোমবার। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ অক্টোবর ঢাকার পিলখানায় এই সেনা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। মেজর জেনারেল শাকিল আহমদ ও কর্নেল গুলজারসহ বিভিন্ন পদবীর মোট ৫৭ জন চৌকস সেনা অফিসারকে সেদিন পিলখানায় হত্যা করা হয়। শুধু হত্যা নয়, তাদেরকে হত্যা করে লাশ ক্ষত বিক্ষত করা হয়েছিল। কারো কারো লাশ ময়লার ড্রেনে নিক্ষেপ করা হয়। একাধিক লাশ আগুনে পুড়ে ফেলা হয়। কিছু লাশ মাটি চাপা দেয়া হয় পিলখানার ভেতরে। শেষ পর্যন্ত দু’টি লাশের সন্ধান-ই পাওয়া যায়নি।

হাইকোর্ট আজ রায় ঘোষণা করে নৃসংশ এ হত্যাকণ্ডের বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিলেও রাজনীতিক বিশ্লেষক, আইন বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকসহ সচেতন মানুষ মনে করছেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সেনা হত্যকাণ্ডের রহস্য অজানাই রয়ে গেছে। নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলী খালাস পাওয়ায় রায় নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গণহারে বিডিয়ার সদস্যদেরকে ফাঁসি আর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলেও হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের নায়করা ধরা ছোয়ার বাইরে রয়ে গেছে বলে মনে করছেন তারা।

২৫ ফেব্রুয়ারি ঘটনার প্রকাশ্য সূত্রপাত হয়েছে সকাল ৯টা ১০ মিনিটে। বিডিআর ডিজি দরবার হলে বক্তব্য রেখে কুশল বিনিময়ের পরপরই ঘটনার সূত্রপাত হয়। ৯টা ১৫ মিনিটে পিলখানার ভেতরে থেমে থেমে গুলি বর্ষণ করে করে খুনি চক্র। সকাল ১০টার মধ্যে একাধিক সেনা কর্মকর্তা সেনা সদরে উর্ধ্বতন অফিসারদের মোবাইলে অবহিত করেছেন তারা জওয়ানদের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন। উদ্ধারের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। তাদের অনুরোধ অনুযায়ী উর্ধ্বতন অফিসারদের সক্রিয়তায় সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১ টার মধ্যে পিলখানার সকল গেটে র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর নিয়োজিত ইউনিট পৌছে যায়। তারা ভেতরে ঢুকে অপারেশন চালানোর জন্য চুড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষা করতে থাকে। তারা বার বার চেষ্টা চালিয়েও চুড়ান্ত নির্দেশ না পাওয়ায় সেনা অফিসারদের উদ্ধার অভিযানে অপারেশন শুরু করতে ব্যর্থ হয়। প্রশ্ন হচ্ছে কার স্বার্থে এবং কেন অফিসারদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী এবং র‌্যাব প্রস্তুত থাকার পরও অভিযানের নির্দেশ দেয়া হল না?

এরপর, সেদিনের ঘটনায় স্ত্রীসহ নিহত বিডিআর ডিজি শাকিল আহমদের ছেলে রাকিন আহমদ একটি পত্রিকা ও এন টিভিতে দেয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনিও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তৎকালীন সেনা প্রধানের কাছে জানতে চেয়েছিলেন তাঁর বাবাকে উদ্ধারে সেনা অভিযান চালানো হল না কেন? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন তিনি চাচ্ছিলেন সেনা বাহিনী অভিযান চালিয়ে পিলখানা থেকে অফিসারদের উদ্ধার করুক। কিন্তু সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ সাড়া দেয়নি। অপর দিকে জেনারেল মঈন জানিয়েছেন তিনি অভিযান চালাতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দেননি। এখানেও অনেক রহস্য লুকায়িত ছিল বলে মনে করছেন সচেতন মানুষ।

আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে ১৩ জন খুনিকে সেদিন বিকাল ৩টায় পিলখানা থেকে নানক এবং আজম মিলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিয়ে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় তাদের জন্য অপেক্ষমান ছিলেন। সেখানে সেনা প্রধান মঈন উ আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। তখন কী খুনিদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল সেনা অফিসাররা কোথায়! ডিজি কোথায়? একটি বাহিনীর ডিজি ছাড়া শুধু বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা হয় কেমন করে! সেই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। পরে জানা গেছে, অনেক অফিসার তখনো বেঁচে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে ফিরে যাওয়ার পর বাকী সবাইকে খুন করা হয়।

এরপর, রাত ১টায় বিদ্যুতের আলো বন্ধ করে দেয়া অন্ধকারাচ্ছন্ন পিলখানায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন এবং আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম প্রবেশ করলেন কোন ভরসায়? তারা জানতেন অন্ধকারেও তাদের গায়ে কেউ আছড় কাটবে না। সেখানে গিয়ে রাতের অন্ধকারে অস্ত্র সমর্পন নাটক করা হল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আইন প্রতিমন্ত্রী কী খোঁজ নিয়েছিলেন বিডিআর ডিজি কোথায় বা অন্য অফিসাররা কোথায়! খুনিদের সঙ্গেই তাদের যত বোঝাপড়া। অনেকেই মনে করেন এই বোঝাপড়া ছিল একটি সাজানো নাটক।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, পিলখানার পাশে আম্বালা রেস্টুরেন্টে খুনিদের সঙ্গে বৈঠকের পর ফজলে নূর তাপস মাইকিং করলেন কার স্বার্থে? ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৬টায় ফজলে নূর তাপস ৩ কিলোমিটার এলাকা থেকে জনগনকে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানালেন কেন? ফজলে নূর তাপসের অনুরোধে মানুষ ওই এলাকা ছেড়ে চলে যায়। এতে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে খুনিরা নিরাপদে পিলখানা ত্যাগ করে। খুনিদের নিরাপদে পিলখানা ত্যাগ করার সুযোগ কেন কার স্বার্থে করা হয়েছিল?

সর্বশেষ নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া আওয়ামী লীগ নেতা হাইকোর্টের রায়ে বেকসুর খালাস পাওয়ায় এ নিয়ে এখন বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও রায়ের নিরপেক্ষতা নিয়ে লোকজন প্রশ্ন তুলেছে। অনেকেই বলছেন, সরকার বিএনপি নেতা পিন্টুকে জেলে রেখে তিলে তিলে হত্যা করে নিজের দলের নেতা তোরাব আলীকে খালাস দিয়েছে।

তথ্যসূত্র: অ্যানালাইসিস বিডি

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here