পাঁচজন কি আর ফিরবেন না?

পূর্বপশ্চিম বিডি ডট নিউজের সাংবাদিক উৎপল দাসের মা বিমলা রানী দাসের চোখের পানি আর শুকায় না। তাঁর ছোট ছেলেটি প্রতিবছর জন্মদিনে মাকে ফোন করে আশীর্বাদ চাইতেন। গতকাল মঙ্গলবার ছিল ছেলেটির ২৯তম জন্মদিন, কিন্তু মায়ের ফোন আর বাজেনি। দিনভর অপেক্ষায় কেটেছে তাঁর। তিনি শুধু জানতে চান, তাঁর নিখোঁজ ছেলেটি বেঁচে আছেন কি না।

গত ১০ অক্টোবর পূর্বপশ্চিম বিডি ডট নিউজ কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর থেকে উৎপল নিখোঁজ। কিছুটা খেয়ালি উৎপল আগেও পরিবার, সহকর্মী ও বন্ধুদের না জানিয়ে উধাও হয়ে থেকেছেন। শুরুর দিকে তাঁর নিখোঁজ হওয়া নিয়ে তেমন উদ্বেগ ও আশঙ্কা না থাকলেও তিন সপ্তাহ পর এখন সবাই অস্থির হয়ে উঠেছেন। উৎপল কোথায় কেমন আছেন, তিনি বেঁচে আছেন কি না, তিনি আর কখনো ফিরবেন কি না—তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় সবাই।

উৎপলের মা-বাবা, ভাইবোনের মতো অপেক্ষায় আছেন আরও অনেকে। গত ২২ থেকে ২৭ আগস্টের মধ্যে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন চারজন। নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ বিএনপির সহসভাপতি ও এবিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাদাত, কল্যাণ পার্টির মহাসচিব আমিনুর রহমান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বেলারুশের অনারারি কনসাল অনিরুদ্ধ রায় এবং কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশরাক আহমেদ।

র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, তাঁরা নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। একই মন্তব্য করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান।

উৎপলের বোন বিনীতা দাস গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, উৎপলের জন্মদিনে তাঁর মা বিমলা রানী দাস ছিলেন ভীষণ অস্থির। ছেলের জন্য তিনি এখন শয্যাশায়ী। তিনি আরও বলেন, তাঁরা র‍্যাব-পুলিশ সবার
সঙ্গেই যোগাযোগ করেছেন, কিন্তু কারও কাছ থেকে আশ্বস্ত হওয়ার মতো কোনো তথ্য তাঁরা গতকাল পর্যন্ত পাননি।

বনানী উড়ালসড়কের নিচ থেকে সন্তানের সামনেই সাদাপোশাকে একদল অপহরণকারী ২২ আগস্ট সাদাত আহমেদকে তুলে নিয়ে যায়। সাদাত আহমেদের স্ত্রী এ ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় অপহরণ মামলা করেন। গতকাল পর্যন্ত তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সাদাতের একজন স্বজন। র‍্যাব-পুলিশ কেউ তাঁর ব্যাপারে কিছু বলতে পারেনি।

কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিখোঁজ শিক্ষার্থী ইশরাক আহমেদ ২৬ আগস্ট থেকে নিখোঁজ। ধানমন্ডির স্টার কাবাবে বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন। আর বাড়ি ফেরেননি। জুনে ছুটি কাটাতে দেশে আসা ইশরাকের সেপ্টেম্বরে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। ইশরাকের বাবা মো. জামালউদ্দিন আহমেদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এমন একটা দিন নেই যে আমি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যাইনি। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও যাচ্ছি। কেউ কোনো খোঁজ দিতে পারছে না।’

নিখোঁজ আছেন ব্যবসায়ী ও রুশ অনারারি কনসাল অনিরুদ্ধ রায়। তাঁর স্বজনেরা সম্ভব সব জায়গায় যোগাযোগ করে অনিরুদ্ধ বেঁচে আছেন কি না, শুধু এ খবরটুকুই জানতে চাইছেন। তাঁর স্ত্রী শাশ্বতী রায় গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা কেমন জীবন? আমার তিন সন্তান, একটি অটিস্টিক। ওদের বাবার খোঁজ নেই। সন্তানেরা গৃহবন্দী। তার চেয়ে আমাদের মৃত্যু ভালো।’ অনিরুদ্ধ রায়কে ২৭ আগস্ট ইউনিয়ন ব্যাংকের সামনে থেকে বিকেল ৪টা ১৯ মিনিটে একটি রুপালি রঙের মাইক্রোবাস থেকে নেমে তিনজন তুলে নিয়ে যায়। শাশ্বতী বলেন, ওই ভিডিও ফুটেজ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কাছে আছে। তারপরও পুলিশ তাঁর স্বামীকে খুঁজে পাচ্ছে না। শাশ্বতীর দিন কাটছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আর মানবাধিকার সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘুরে।

২৭ আগস্ট রাতে কল্যাণ পার্টির অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময় নিখোঁজ হন দলটির মহাসচিব আমিনুর রহমান। এ ঘটনায় পল্টন থানায় আমিনুর রহমানের ভাই সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। অকৃতদার আমিনুরের অসুস্থ মা ছেলের ফেরার অপেক্ষায় আছেন। তাঁর সন্ধান চেয়ে পরিবার সংবাদ সম্মেলন করেছে। গতকাল তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী এম আর এফ সোহেল মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তো কোনো খবর পাচ্ছি না, আপনারা যদি কোথাও কোনো সন্ধান পান, দয়া করে জানাবেন।’

সূত্র: প্রথম আলো

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here